পিপিই নিয়ে উদ্বেগ: চিকিৎসকের ঠাঁই হলো মানসিক হাসপাতালে

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-21 23:54:21 BdST

পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় প্রথমে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর এবার মানসিক হাসপাতালে ঠাঁই হল ভারতীয় এক চিকিৎসকের।

২০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অ্যানেস্থেটিস্ট ডা.সুধাকর রাওয়ের এমন ঘটনার শিকার হওয়ার খবর জানিয়েছেন বিবিসি তেলেগুর সংবাদদাতা ভি শঙ্কর।

দু’মাসের মধ্যে এ নিয়ে দু’বার সংবাদ শিরোনাম হলেন চিকিৎসক সুধাকর। তার বাস অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তম শহরে। কর্মস্থলও সেখানেই।

ভাইরাল হওয়া বেশ কয়েকটি ভিডিওতে ওই এলাকার মহাসড়কে তাকে পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে দেখা গেছে।পরে তাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পিপিই’র স্বল্পতা এবং হাসপাতালগুলোতে এসব সরঞ্জামের অভাব থাকা নিয়ে কথা বলার কারণে ভারতীয় চিকিৎসকদের বিরূপ আচরণের শিকার হওয়ার খবরের মধ্যেই নতুন করে সামনে এল সুধাকরের ঘটনাটি।

কি ঘটেছিল সুধাকর রাওয়ের?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে ব্যাপকভাবে শেয়ার হওয়া কিছু ভিডিওতে শনিবার থেকে বেশ কিছু ঘটনা দেখা গেছে।

একটি ঘটনায় প্রথমেই দেখা যায়, রাস্তার পাশে নিজ গাড়িতে খালিগায়ে বসে আছেন সুধাকর রাও। পুলিশের সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলছেন তিনি।

আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, সুধাকরের দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। তিনি রাস্তার ওপর পড়ে আছেন। একজন কনস্টেবল তাকে লাঠিপেটা করছে।

সর্বশেষ আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ কর্মকর্তারা মানুষজনের সামনেই তাকে ধরেবেঁধে অটোরিক্সায় তুলছে। ওই সময় সুধাকর আশেপাশে ঘটনা দেখতে জড়ো হওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।

অভিযোগ করে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যরা তার গাড়ি থামিয়ে তাকে জোর করে বাইরে বের করেছে। ফোন, ওয়ালেট কেড়ে নিয়েছে। মারধরও করেছে।

তাকে আটকের এ ঘটনায় বিস্তর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলা নিয়ে রাজ্য সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী ও অন্যান্যরা।

সুধাকরের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। সুধাকর আগে থেকেই চাকরি থেকে বরখাস্ত থাকার কারণে তাকে হেনস্থার এ ঘটনা আরো ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর সুধাকরকে মারধর করা ওই কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তদন্ত মুলতবি রয়েছে।

সুধাকর বরখাস্ত হয়েছিলেন কেন?

সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক সুধাকর রাও গত ৩ এপ্রিল গণমাধ্যমে বলেন, চিকিৎসকদেরকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা গাউন ও মাস্ক দেওয়া হয়নি।

তিনি জানান, এক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে কথা তোলায় তাকে তৎক্ষণাৎ বৈঠক থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়।

একটি ভিডিও ক্লিপে স্থানীয় টেলিভিশন সাংবাদিকদের কাছে সুধাকর প্রশ্ন রাখেন, “নতুন মাস্ক চাওয়ার আগে আমাদেরকে ১৫ দিন একই মাস্ক ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা কিভাবে রোগীদের চিকিৎসা করব? ভিডিওটি সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাল হয়।

সরকার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে সুধাকরকেও বরখাস্ত করে। এ ব্যাপারে কর্মকর্তারা বলছেন, সুধাকর বিষয়টি নিয়ে নিয়মমাফিকভাবে অভিযোগ না জানিয়েই গণমাধ্যমে কথা বলে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নৈতিক ক্ষতি করেছেন।

এর কয়েকদিন পরে সুধাকর রাও ক্ষমা চেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন এবং তাতে তিনি বরখাস্তের আদেশ বাতিলেরও অনুরোধ জানান। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয় নি।

কি বলছেন সুধাকর?

কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতালে সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব নিয়ে কথা বলার পর থেকেই সুধাকর হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এমনই অভিযোগ সুধাকর রাও ও তার পরিবারের।

গত শনিবার সুধাকর এও বলেছেন যে, কয়েকদিন ধরে টেলিফোনে লোকজনের হুমকি পেয়েছেন তিনি।

সুধাকরের মা কাবেরি রাও বিবিসি তেলেগুকে বলেন, তার ছেলের কোন মানসিক সমস্যা নেই। বরং সে একজন নামকরা চিকিৎসক। কিন্তু পিপিই নিয়ে কথা বলার পর থেকেই তার ছেলেকে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

কাবেরি বলেন, “যখন মানুষ আমাকে ফোন করে তার ব্যাপারে জানতে চায়, তখন আমার খুব খারাপ লাগে। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার ছেলে খুব মানসিক চাপে আছে।”

সরকারি ভাষ্য কি?

পুলিশ বলেছে, মহাসড়কে এক ব্যক্তি মদ্যপ আচরণ করছেন এমন খবর পেয়েই তারা সেখানে গেছেন।

বিশাখাপত্তম পুলিশ কমিশনার আরকে মিনা বিবিসি তেলেগুকে বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তারা জানতেন না যে, ওই ব্যক্তি ডা. সুধাকর রাও।

পুলিশের ভাষ্য, তিনি রাস্তায় দেওয়া একটি ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিলেন এবং রাস্তায় মদের বোতল ছুড়ে মেরেছিলেন।

পুলিশ সেখানে যাওয়ার আগেই পথচারীরা তাকে ধরে দড়ি দিয়ে তার হাত বাঁধে। পুলিশকে বাধা দেওয়া এবং ক্ষয়ক্ষতি করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

তবে কে মামলা করেছে তার কোনো পরিচয় প্রকাশ করা হয় নি এবং সরকারি এ ভাষ্যের সমর্থনে এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায় নি। একটি ভিডিওতে কেবল দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষের সহায়তায় সুধাকরের হাত বাঁধছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনার মিনা বলেন, “ওই সময় সুধাকর পুলিশের সঙ্গে রুঢ় ব্যবহার করেছেন। একজন কনস্টেবলের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলেছেন।তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলেই মনে হয়েছে।”

ফলে সুধাকরকে প্রথমে একটি পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে প্রাথমিক পরীক্ষা করার জন্য একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে মানসিক কোনো হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।