বিশ্বের প্রথম টিকার মডেল হওয়া ভারতীয় রানিদের গল্প

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-09-21 01:30:39 BdST

গুটিবসন্ত রোগ নির্মূলেই বিশ্বে প্রথম টিকা ব্যবহার করা হয়। ভারতে গুটিবসন্তের এই টিকার প্রচারে পর্দা ছেড়ে বেরিয়ে এসে মডেল হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন রাজপরিবারের রানিরা।

মহীশূরের রানি দেভজামিনি বসন্ত রোগের টিকাকে জনপ্রিয় করতে একরকম অসাধ্যসাধন করে ইতিহাস গড়েন। শুধু টিকা নেওয়াই নয়, এর প্রচারে ব্রিটিশ চিত্রকরের ছবির মডেলও হয়েছিলেন এই রানি।

২শ’ বছর আগের সাহসী এই ভারতীয় রানিদের বিস্মৃত ইতিহাস নতুন করে তুলে এনেছে প্রাচীন এক তৈলচিত্র। যে সময় ছবিটি আঁকা হয়, তখন ভারতের রাজপরিবারগুলো ছিল যথেষ্ট রক্ষণশীল। রাজপরিবারের বউদের ছবির জন্য পোজ দেওয়া সে সময় ছিল অকল্পনীয়৷ ওয়দিয়ার রাজপরিবার সেদিক থেকে ছবির জন্য অনেকটাই ঝুঁকি নিয়েছিল। রাজা -রানি দুজনের বয়স কম থাকাতেই এটি সম্ভব হয়েছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদদের অনেকে।

বিবিসি জানায়, ১৮০৫ ‍সালে কৃষ্ণরাজা তৃতীয় ওয়াদিয়ারকে বিয়ে করে মহীশূরের রানী হয়ে এসেছিলেন দেভজামিনি। ওই সময় দুইজনের বয়সই ছিল ১২ বছর। দেভজামিনিকে বিয়ের কিছুদিন আগেই সিংহাসনে বসেন তৃতীয় ওয়াদিয়ার।

শুধু রাজ্যের রানি হিসেবেই নয়, বরং কিছুদিনের মধ্যে মানুষের কল্যাণে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন রানি দেভজামিনি। ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতে গুটিবসন্তের টিকার প্রচারের জন্য তৈলচিত্রের মডেল হতে রাজি হন তিনি।

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ড. নাইজেল চ্যান্সেলর বলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুরোধেই ভারতীয়দের ‘গুটিবসন্তের টিকা প্রকল্পে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য’ তৈলচিত্রে মডেল হয়েছিলেন রানি।

তখনও গুটিবসন্তের টিকা একেবারেই নতুন। মাত্র ছয় বছর আগে ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেছেন। ওই টিকার কার্যকারিতার উপর ‍মানুষের তখন আস্থাও জন্মায়নি।

ওই সময় ভারতের সমাজ ব্যবস্থায় নানা কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ প্রচলিত ছিল। তার উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসার নামে এসে সবে ভারতে নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটাতে শুরু করেছে।

কোম্পানি রাজনীতি, ক্ষমতা ও প্রচারের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বিশ্বের প্রথম টিকার পরিচয় করিয়ে দিতে জোর চেষ্টা করছিল। এটি ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের উপনিবেশবাদের সূচনার সবচেয়ে বড় পদক্ষেপও ছিল।

কোম্পানি ব্রিটিশ চিকিৎসক, ভারতীয় টিকাদানকারীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান, এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা রাজপরিবারের সদস্যদের তাদের টিকা প্রকল্পে যুক্ত করেন। ৩০ বছর পর সিংহাসন ফিরে পেতে সাহায্য করায় ওয়াদিয়ার রাজ পরিবার ওই সময়ে ইংরেজদের সমর্থন করে।

চিত্রকর্মে থাকা নারীরা:

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ড. চ্যান্সেলরের বিশ্বাস, ১৮০৫ সালে আঁকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওই চিত্রকর্ম শুধু রানির টিকা নেওয়ার প্রমাণই নয় বরং কীভাবে ভারতে ব্রিটিশদের টিকা প্রকল্প সফল হয়েছিল তার প্রমাণও বটে।

চিত্রকর্মটি সর্বশেষ ২০০৭ সালে প্রথম ব্রিটিশ সোথবাই নিলাম হাউজের মাধ্যমে বিক্রির চেষ্টা চলেছিল। তবে  ড. চ্যান্সেলর চিত্রকর্মটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করার আগ পর্যন্ত এ ছবি কী কারণে আঁকা হয়েছিল তা কারও জানা ছিল না।

 চিত্রকর্ম: সোথবাই

 চিত্রকর্ম: সোথবাই

চিত্রকর্মে ডানে প্রথমে দাঁড়ানো নারীকে রাজা তৃতীয় ওয়াদিয়ারের ছোট ‍রানি দেভজামানি হিসাবে সনাক্ত করেছেন চ্যান্সেলর।

তিনি বলেন, তখন প্রচলিত নিয়মানুযায়ী শাড়ি দিয়ে রানির নিজের বাম হাত ঢেকে রাখার কথা। কিন্তু ছবিতে তিনি ডান হাতে শাড়ির আঁচল তুলে ধরে বাম হাতের পুরো অংশ বের করে রেখেছেন। কোন হাতে টিকা নিয়েছেন তা দেখাতেই এটি করা হয়েছে।

“ছবিতে তার মুখভঙ্গি বলে দিচ্ছে হাত বের করে রাখতে তিনি কিছুটা লজ্জা পাচ্ছেন।”

ছবিতে সব থেকে বাঁয়ে দাঁড়ানো রানি রাজা ওয়াদিয়ার প্রথম স্ত্রী বলে বিশ্বাস ড. চ্যান্সেলরের। বড় রানির নামও দেভজামানি। ছবিতে তার মুখে নাকের নিচের অংশ এবং ঠোঁটের চারপাশের চামড়া সাদাটে হয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

ওই সময় গুটিবসন্ত থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির ফুস্কুড়ির শুকিয়ে যাওয়া চামড়া গুড়ো করে সুস্থ মানুষকে নাক দিয়ে টেনে নিতে বলে শরীরে নিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ ঘটানো হত। তখন ওই ব্যক্তির শরীরে মৃদু সংক্রমণ ঘটে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতেন এবং শরীরে প্রকৃতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠত। টিকা আবিষ্কারের আগে এভাবেই গুটিবসন্তের চিকিৎসা হত, যেটা ‘ভেরিওলেশন’ নামে পরিচিত।

“ভেরিওলেশনের পর সাধারণ মানুষের দেহের চমড়ায় কোথাও কোথাও বড় রানির মত এমন সাদাটে হয়ে যেত।”

চিত্রকর্মের সঙ্গে নিজের বক্তব্যের প্রমাণস্বরূপ ড. চ্যান্সেলর ২০০১ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সংযুক্ত করেছেন। ওই চিত্রকর্মের তারিখের সঙ্গে রাজা তৃতীয় ওয়াদিয়ার বিয়ের তারিখ মিলে যায়। ১৮০৫ সালের জুলাইয়ে একটি কোর্ট রেকর্ডে দেখা যায়, রানি দেভজামানির টিকা নেওয়ার ছবি প্রকাশের পর জনগণ টিকা নিতে উৎসাহিত হয়েছিল।

এছাড়া, ছবিতে তিন নারী যে ধরনের অলংকার পরে আছেন সেটা ওয়াদিয়ার রানীরাই পরতেন। শিল্পী টমাস হিকি এই ছবিটি এঁকেছেন। এটা ছাড়াও ওয়াদিয়ার রাজপরিবারের সদস্যদের আরও ছবি এঁকেছেন তিনি।

টিকা নিয়ে রাজনীতি:

ছবিতে যে তারিখ দেওয়া আছে, ওই সময়টা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য কিছুটা কঠিন সময় যাচ্ছিল। ১৭৯৯ সালে তারা মহীশূরের টিপু সুলতানকে পরাজিত করে ওয়াদিয়ারদের ক্ষমতায় বসান। তারপরও নিজেদের কর্তৃত্বের ব্যাপারে তারা আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। তখনই তৎকালীন মাদ্রাজের গভর্নর উইলিয়াম বেন্টিক প্রাণঘাতী রোগ গুটিবসন্ত প্রতিরোধের টিকা প্রয়োগ নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক ফয়দা লুটার সুযোগ দেখতে পান।

ব্রিটিশরা মূলত ভারতে বসবাস করা ইংরেজদের সুরক্ষায় প্রথম সেখানে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। ইতিহাসবিদ মাইকেল বেনেট তার ‘ওয়ার এগেইনস্ট স্মলপক্স’ বইতে এমনটাই লিখেছেন।

তার আগে ভারতে ‘ভেরিওলেশন’ পদ্ধতিতে গুটিবসন্তের চিকিৎসা হত। এছাড়া, নানা ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে ওই সময় গুটিবসন্ত থেকে মুক্তির চেষ্টা করা হত। হিন্দুরা গুটিবসন্তকে অসুখ মনে করত না, বরং দেবী শীতলার ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করত। গুটিবসন্তের প্রকোপ কমাতে কোথাও কোথাও শীতলার পুজোও করা হত।

ফলে ইংরেজরা যখন হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে গুটিবসন্তের টিকা দেওয়ার চেষ্টা করে তখন তাদের জন্য কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। গুটিবসন্তের টিকায় ‘কাউপক্স ভাইরাস‘ ব্যবহার করায় ভারতীয় হিন্দুরা বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করেনি। এছাড়া, যারা ‘ভেরিওলেশন’ দিতেন তাদের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ে যায়। ‘কাউপক্স’ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে পালের গরু মরে সাফ হয়ে যাওয়ার গুজবও ছিল।

তবে সব থেকে বড় বাধা ছিল তখনকার টিকা প্রদান পদ্ধতি। এই টিকা তখন একজনের বাহু থেকে অন্যজনের বাহুতে দিতে হত। প্রথমে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা পুঁজ একজনের দেহে সুঁচ বা ধারাল কিছু দিয়ে কেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। সাতদিন পর সেখানে পুঁজ তৈরি হলে সেটা কেটে বের করে অন্যদের দেহে দেওয়া হত।

১৮০০ সাল থেকে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে টিকা পাঠানোর চেষ্টা করছিল। দুই বছর পর ১৮০২ সালের মার্চে ভিয়েনা হয়ে বাগদাদে টিকা পৌঁছায়। সেখানে আরমেনিয়ার একটি শিশুর দেহে টিকা দেওয়া হয় এবং তার দেহ থেকে পুঁজ সংগ্রহ করে পাঠানো হয় ইরাকের বাসরায়। সেখান থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সার্জন সেটা বোম্বে (মুম্বাই) নিয়ে আসেন।

১৯০২ সালের ১৪ জুন ভারতে অ্যানা ডাস্টহল নামে এক বালিকাকে প্রথম গুটিবসন্তের টিকা দেওয়া হয়। পরের সপ্তাহে অ্যানার শরীর থেকে পুঁজ নিয়ে বোম্বেতে আরো পাঁচ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। এভাবেই টিকা এক বাহু থেকে বহু বাহুতে ছড়িয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত হায়দরাবাদ, কোচিন, তেলিচেরি, চিংলেপুট, মাদ্রাজ হয়ে মহীশূরে পৌঁছায়।

জনগণ টিকার কার্যকারিতা বুঝতে পারায় টিকার প্রচার চলতে থাকে। ভ্যারিওলেশন দেওয়া অনেক টিকাদারও টিকাদান শুরু করেন। অধ্যাপক বেনেট মনে করেন, ১৮০৭ সালের মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি টিকা প্রদান করা হয়েছে।

ওদিকে, চিত্রকর্মটি ঘটনাচক্রে ইংল্যান্ডেও পৌঁছায়। তবে সেখানে এটি লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। ১৯৯১ সালে ড. চ্যান্সেলর এক প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখেন। তারপরই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উন্মোচন করে ওই ভারতীয় রানিদের  বিশ্বের প্রথম টিকার প্রথম দিককার টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের কৃতিত্ব দেন তিনি।