যে এশীয়রা ট্রাম্পের জয় চায়

  • নিউজডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-10-31 15:15:46 BdST

নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন খুব একটা নেই। কিন্তু এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চল ও দেশের মানুষ মনেপ্রাণে ট্রাম্পের জয় চাইছেন। 

‘আমেরিকা প্রথম নীতি’, প্যারিস জলবায়ু ও ইরান পরমাণু চুক্তির মত আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রত্যাহার, অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি, জাতিসংঘের নানা সংস্থার তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি, উদ্ভট বক্তব্য ও আচরণ ইত্যাদি কারণে পুরো মেয়াদ জুড়েই বেশিরভাগ সময় নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়ে সমালোচিত হয়েছেন ট্রাম্প।

কিন্তু তাই বলে দেশের বাইরে ট্রাম্পের ভক্ত-সমর্থকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওইসব অঞ্চল যাদের চীনের সঙ্গে শত্রুতা আছে এবং ‍বাহুবলে দেশটিকে মোকাবেলা করতে অক্ষম। তাদের কাছে ট্রাম্প সবচেয়ে বড় আশার নাম। তাই তারা মনে প্রাণে চাইছে আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হন।

হংকং: ‘একমাত্র ট্রাম্পই চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে পাল্টা জবাব দিতে পারেন’

এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য নগরী হংকং। চীনের অংশ হলেও হংকং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। হংকংয়ের বেলায় চীন ‘এক দেশ দুই নীতি’ মেনে চলে। কিন্তু গত কয়েক বছরে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি হংকংয়ের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করতে চাইছে। অন্যদিকে হংকংয়ের বাসিন্দারা চীনের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চায়। এ দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে হংকংয়ে আন্দোলন চলছে।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণতন্ত্রপন্থিদের ওই আন্দোলন দমন করতে চীন নানাভাবে সেখানে শক্তি প্রয়োগ করছে। চীন সেখানে ‘নিরাপত্তা আইন’ নামে একটি নতুন আইন জারি করেছে। যার ফলে বেইজিং এখন চাইলেই হংকংয়ের যেকোনো বাসিন্দাকে বিচারের নামে চীনের মূলভূখণ্ডে নিয়ে যেতে পারবে। যে আইন বাতিলের দাবিতে হংকং আবারও ফুঁসে উঠেছে। 

হংকংয়ের আন্দোলনকারী এরিকা ইউয়েন বিবিসিকে বলেন, ‘‘চার বছর আগে যখন ডনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হন তখন আমি ভেবেছিলাম এবার যুক্তরাষ্ট্র পাগল হতে চলেছে।

‘‘এছাড়া সবসময় ডেমোক্র্যাটিক পার্টিই আমার পছন্দ ছিল। তবে এখন আমার মনে হচ্ছে, হংকংয়ের ‍অন্য অনেক বিক্ষোভকারীর মত আমিও ট্রাম্পকে সমর্থন করি। কারণ, হংকংয়ের জন্য এখন এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন যিনি চীনের কামিউনিস্ট পার্টিকে পাল্টা আঘাত করতে পারবেন-তিনিই এখন হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারীদের একমাত্র আশা।”

হংকংয়ের উপর চীনের জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে বরাবরই উচ্চকণ্ঠ থেকেছেন ট্রাম্প। 

তাইওয়ান: ‘একজন বড়ভাই যার উপর আমরা নির্ভর করতে পারি’

চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। ১৯৪০ সালের গৃহযুদ্ধে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তাইওয়ান। তারা নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র দাবি করলেও চীন স্বীকৃতি দেয়নি। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশ মনে করে; যেটি একদিন আবার একত্রিত হবে, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে।

যুক্তরাষ্ট্রও অবশ্য নীতগত কারণে দেশ হিসেবে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু ওয়াশিংটন বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাইওয়ানের ঘনিষ্ঠতা উল্লেখ করার মত। তাইওয়ান সব সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বড় মিত্র মানে।

তাইওয়ানের ই-কমার্স কর্মী ভিক্টর লিন বিবিসি কে বলেন, ‘‘আমাদের প্রতি ডনাল্ড ট্রাম্পের আচরণ খুব ভালো। তারমত একজন মিত্র পাওয়া সত্যিই দারুণ। এটা  বৈদেশিক, সামরিক এবং বাণিজ্যের বিষয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দেয়।

‘‘আমাদের (ট্রাম্পের মত) একজন বড় ভাই আছেন যার উপর আমরা আস্থা রাখতে পারি।”

গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ও তাইওয়ান সরকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত করার বিষয়ে বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ওই বাণিজ্য চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হলে চীনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাবে তাইওয়ান। এমনটাই বিশ্বাস করেন লিন। বলেন, ‘‘এটা হলে যতদূর সম্ভব তাইওয়ানের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনের আমন্ত্রণ জানানো হবে।”

লিনের আশঙ্কা, বাইডেন বিজয়ী হলে তিনি হয়তো চীনের ক্রোধের মুখে পড়তে হবে আশঙ্কায় এ ধরনের ‘উস্কানিমূলক পদক্ষেপ’ গ্রহণ করবেন না।

চীনের আপত্তি থাকার পরও তাইওয়ানের কাছে নানা ধরনের ‍অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বিক্রির চুক্তিও করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ভিয়েতনাম: ‘বেপরোয়া হওয়ার মত সাহসী’

গত ৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়ই ভিয়েতনামের মাটিতে যুদ্ধ করেছে। অবশ্য দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটি এতদিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যুদ্ধের স্মৃতি হয়তো ভুলতে বসেছে। কিন্তু চীন এখনো তাদের জন্য ‘হুমকি’ হয়ে আছে।

ভিয়েতমানে অবশ্য ট্রাম্পের ‍দুই ধরনের সমর্থক আছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ভ্লগার লিনহ এনগুয়েন।

তিনি বলেন, একদল শুধু বিনোদন এবং চাকচিক্যের জন্য ট্রাম্পকে পছন্দ করেন। আরেক দল ট্রাম্পের অন্ধ ভক্ত। তারা হংকং ও তাইওয়ানের ট্রাম্প সমর্থকদের মত মনে করেন, চীন ও তাইওয়ানের কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে একমাত্র ট্রাম্পই তাদের রক্ষা করতে পারবেন।

যদিও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ট্রাম্প ভিয়েতনামকে নিয়ে কিছু বলেননি। এমনকি ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেনও না। 

তবে গত চার বছরে ট্রাম্প একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তা হলো: তিনি অন্য দেশের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে বা ‍অভিযানের নামে যুদ্ধ শুরু করতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন।

তাই অনেকে মনে করেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প ‘যেমন বেপরোয়া এবং একগুয়ে আচরণ দেখানোর মত সাহস করেছেন তা সত্যিই পার্থক্য গড় দিয়েছে’।

তারা বলেন, ‘‘এটাই পূর্বসূরীদের থেকে ট্রাম্পকে আলাদা করে দিয়েছে। চীনের সঙ্গে টেক্কা দিতে তার মত একজন নেতা প্রয়োজন।

‘‘ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরই শেষপর্যন্ত বিশ্বনেতারা চীনের বিপদজনক হয়ে ওঠার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন।”

জাপান: ‘এটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়’

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই জাপানকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার এবং মিত্র বলে বিবেচনা করে। কিন্তু ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর তার ‘আমেরিকা প্রথম নীতি’ কারণে অনেকেই টোকিও-ওয়াশিংটন সম্পর্ক নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।

ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই একটি বহুপাক্ষিক ট্রান্স-প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে ওই দুঃশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সেনাদের জন্য জাপানকে আরো ব্যয় বাড়তে বাধ্য করেন।

তারপরও জাপান ট্রাম্পকেই সমর্থন করে বলে মত জাপানের ইউটিউবার ইওকো ইশির।

তিনি বলেন, ‘‘ডনাল্ড ট্রাম্প আমাদের বন্ধু। জাপানের জন্য তাকে সমর্থন দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা।”

এই ইউটিউবার জাপানের আকাশ ও জলসীমায় নিয়মিত চীনের যুদ্ধবিমান ও রণতরীর আনাগোনার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।

এই বিরোধ মূলত দিয়াওইউ দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে। চীন এবং জাপান উভয়ই ওই অঞ্চলটিকে নিজেদের বলে দাবি করে।

ইওকো বলেন, ‘‘আমরা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রে এমন একজন প্রেসিডেন্ট চাই যিনি চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মকভাবে লড়াই করতে পারবেন।

‘‘আমার মনে হয় না আর কেউ চীনের বিরুদ্ধে এতটা স্পষ্টভাষায় কথা বলতে পারবেন বা এ অঞ্চলে তার দৃঢ় উপস্থিতি থাকবে। তাই ডনাল্ড ট্রাম্পকেই বিজয়ী হতে হবে।”

তবে ইওকো যতই ট্রাম্পের প্রশংসা করুন, তার বিজয় নিয়ে জাপানিরা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না। মাত্র একচতুর্থাংশ জাপানি মনে করেন এবারও ট্রাম্প জিতবেন।

বরং অনেকে মনে করেন, বাইডেন জিতলে হয়তো তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ট্রান্স-প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তিতে নিয়ে আসবেন এবং অর্থনীতি ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রে টোকিওর সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলবেন।