পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

বাইডেন-পুতিন বৈঠক: আসলে কী চান পুতিন?

  • নিউজ ডেস্ক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-06-15 23:37:29 BdST

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বুধবার জেনিভায় বৈঠকে বসতে চলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

কিন্তু এই বৈঠক যে মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ হবে না, তা স্পষ্ট।

রাশিয়া এরই মধ্যে তাদের অবন্ধু-সুলভ দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম যোগ করেছে। দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক যে তলানিতে ঠেকেছে তা নিয়েও একমত রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই নেতা।

কোনো দেশেই এখন অপর দেশের রাষ্ট্রদূত নেই। ঊর্ধ্বতন রুশ কর্মকর্তাদের ওপরও জারি আছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপে রাশিয়ার দখলদারিত্ব এবং অন্য দেশের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

তাছাড়া, দুইজন সাবেক মার্কিন মেরিন সেনা এখন রাশিয়ার কারাগারে বন্দি। এদের একজন গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১৬ বছরের সাজা খাটছেন।

এই সবকিছুর ওপর নতুন মাত্রা যোগ করেছে গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের একটি মন্তব্য।

ওই সময় এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ’একজন খুনি’ বলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর সঙ্গে একমত পোষণ করেছিলেন বাইডেন।

তবে এত কিছুর পরও দুই দেশের প্রেসিডেন্টই এবার প্রথম মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চলেছেন। তাই এটাকেও এক বড় অর্জন বলেই মনে করছেন রাশিয়ার কিছু মানুষ।

এই প্রেক্ষাপটে বাইডেন ও পুতিনের মধ্যকার এই বৈঠকের গুরুত্বটা তাহলে কী, পুতিনের জন্যই বা এ বৈঠকের কী তাৎপর্য, কী হতে পারে সম্ভাব্য ফলাফল- তা এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে বিবিসি।

মর্যাদার প্রশ্ন

ছবি-স্ক্রিনশট: ইউটিউব

ছবি-স্ক্রিনশট: ইউটিউব

মস্কোর একটি গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আন্দ্রেই কুর্তানভ বলেন, “প্রতীকী তাৎপর্যের কথা বিবেচনা করলে এ বৈঠক অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ; এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এক কাতারে স্থান পাচ্ছে। পুতিনের কাছে এই প্রতীকী ব্যাপারটি গুরুত্বহীন নয়।”

বৈঠকটি হচ্ছে প্রেসিডেন্ট বাইডেন হোয়াইট হাউজে যাওয়ার একেবারে প্রথম পর্যায়ে, তার প্রথম বিদেশ সফরকালে এবং তারই অনুরোধে। এসবই ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য বোনাস পয়েন্ট।

তাছাড়া, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শীর্ষ বৈঠক, কোনও অনুষ্ঠানের ফাঁকে সেরে ফেলার মতো সংক্ষিপ্ত বৈঠক নয়।

জো বাইডেনের ব্যস্ততার মধ্যে কাটানো ইউরোপ সফর এবং নেটো বৈঠক নিয়ে ব্যস্ততার মাঝেও তার সফর-সূচির শেষ আকর্ষণ হয়ে আছে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বুধবারের একান্ত বৈঠকটি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিলিয়া শেভৎসোভা বলছেন, “পুতিন নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সমানে সমান হতে চান। তিনি চান তার মতো করে যেন তিনিও শ্রদ্ধা পান। পুতিন তার পৌরুষদীপ্ত পেশী প্রদর্শন করতে চান আবার এই ক্লাবের সদস্যও হতে চান।”

ইতিহাস এবং আশা

ভ্লাদিমির পুতিন এবং জো বাইডেনের শীর্ষ বৈঠকের স্থান হিসাবে জেনিভাকে বেছে নেওয়াটা স্নায়ুযুদ্ধ যুগে ১৯৮৫ সালের শীর্ষ এক বৈঠকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান এবং সোভিয়েত নেতা মিখাইল গরবাচভের মধ্যে প্রথম হয়েছিল সে বৈঠক।

যদিও এ সপ্তাহের শীর্ষ বৈঠকটি সেই বৈঠকের মতো হওয়ার সম্ভাবনা কম।

রিগ্যান এবং গরবাচভ যেভাবে সুসম্পর্ক স্থাপন করে রাজনৈতিক বরফ গলাতে সক্ষম হয়েছিলেন, পুতিন-বাইডেন বৈঠক থেকে তেমনটা আশা করা যাচ্ছে না।

হোয়াইট হাউজ বলছে, তারা রাশিয়ার সঙ্গে একটি স্থিতিশীল এবং অনুমান করা যায় এমন সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু পুতিন সবসময় মানুষকে ধন্দে এবং দুশ্চিন্তায় রাখার মতোই কাজ করেন।  

২০১৪ সালে সেনা পাঠিয়ে ইউক্রেইনের কাছ থেকে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের সময় থেকেই পুতিন এমন ধারাই বজায় রেখেছেন।

রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতিটাও শুরু তখন থেকেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিলিয়া শেভৎসোভার মতে, এ শীর্ষ বৈঠকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে, দু’পক্ষের শেষ সীমা (রেড লাইন) পরীক্ষা করা। আর এই উপলব্ধিতে পৌঁছানো যে, আলোচনার মধ্য দিয়েই এ অতল গহ্বর থেকে উঠে আসতে হবে। যদি দুপক্ষ কোনও আলাপ না করে তখন রাশিয়ার কর্মকাণ্ড আঁচ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

তারা কি পারবেন?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ সপ্তাহান্তে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে পারার মতো কিছু বিষয় আছে।”

এর মধ্যে আছে, পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন করে আলোচনা, সিরিয়া-লিবিয়া পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে আলোচনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়।

পুতিন বলেন, “আমরা এসব বিষয়ে কাজ করার কৌশল খুঁজে পেলে বলতে পারব এ শীর্ষ বৈঠক ব্যর্থ হয়নি।”

রাশিয়ায় কেউ কেউ এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছেন যে, দুই দেশের চলমান ‘কূটনৈতিক যুদ্ধে’ একটা সাময়িক বিরতিও সম্ভব হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি কয়েক ডজন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করাসহ দুটি রুশ দূতাবাস ভবন বন্ধ করেছে। পাল্টা জবাবে রাশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে স্থানীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ হচ্ছে, ফলে ভিসা থেকে শুরু করে অন্যান্য সেবাও নাটকীয়ভাবে কমেছে।

তবে ন্যূনতম ছাড় হিসেবে মস্কো হয়ত তাদের রাষ্ট্রদূতকে ওয়াশিংটনে ফিরে যেতে দিতে পারে।

পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ায় বন্দি মার্কিন নাগরিকদের বিষয়টি তুলতে পারে। এর মধ্যে আছেন পল হুইলান, যাকে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করা হয় এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়। হুইলান সবসময়ই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

রাশিয়া সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে বন্দি বিনিময়ের বিষয়টিতে বারবার চাপ দিয়েছে। কিন্তু যেসব শর্ত তারা দিচ্ছে তা মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম্ভব। পুতিন এক্ষেত্রে এককভাবে কোন ঔদার্যের পরিচয় দেবেন তেমন সম্ভাবনাও নেই।

বৈরি পশ্চিমা বিশ্ব:

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পশ্চিমা দেশগুলোকে বৈরি শক্তি আখ্যা দিয়েছেন। এ মাসে সেন্ট পিটার্সবার্গে অর্থনৈতিক ফোরামের এক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে রাশিয়ার উন্নয়ন ঠেকাতে চায়।

এর কয়েকদিন আগে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, কোন বিদেশি আগ্রাসী শক্তি রাশিয়াকে দংশন করতে চাইলে তাদের দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া তার মর্যাদা এবং শক্তি ফিরে পেয়েছে সে বিষয়ে বিশ্বের সচেতন থাকা দরকার।

মস্কোর গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ‘আরআইএসি’ পরিচালক আন্দ্রেই কুর্টানভ বলছেন, “তিনি স্পষ্টতই বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শত্রু, তারা রাশিয়ার ভাল চায় না।” যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তার এই দৃষ্টিভঙ্গির কোনও পরিবর্তন হবে বলেও মনে করেন না কুর্টানভ।

তবে তার পরও রাশিয়া হয়ত বর্তমান উত্তেজনা কিছুটা কমিয়ে আনার কথা ভাবছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উত্তেজনা প্রশমন:

ছবি- স্ক্রিনশট বিবিসি

ছবি- স্ক্রিনশট বিবিসি

কুর্টানভ মনে করেন, “একজন যুক্তিবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে পুতিন হয়ত চাইবেন এই বৈরি সম্পর্কের মূল্য এবং ঝুঁকি কমিয়ে আনতে।”

এর মধ্যে আছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়। যে নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার তহবিল সংগ্রহ সীমিত হয়ে পড়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব হয়ত আরও অনেক দূর গড়াবে, গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের বছরে এর বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে রাশিয়ার অর্থনীতিতে।

কুর্টানভ বলেন, “দেশের ভেতরে চলমান নানা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে রুশ জনগণের এখন আর পররাষ্ট্রনীতির ‘বিজয়’ দেখার আগ্রহ নেই।”

“পুতিন যা-ই চান না কেন, আমার মনে হয় না উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তিনি দেশের জন্য কোনও ফায়দা তুলতে পাবেন।"

মানবাধিকার নিয়ে কথা:

পুতিন চান না, কিন্তু তাকে শুনতেই হয় এমন একটি বিষয় হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়ে লেকচার। বিশেষ করে বর্তমানে রাশিয়ার বন্দি বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ আলেক্সি নাভালনি প্রসঙ্গসহ এমন নানা বিষয়ে তাকে কথা শুনতেই হচ্ছে।

মস্কোর এটি আদালত নাভালনির রাজনৈতিক দপ্তর এবং তার দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাকে ''চরমপন্থি' তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। আদালতের এই রায় ইচ্ছে করলেই শীর্ষ বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত পেছানো যেতে পারত।

কিন্তু তা না করে এরকম একটি সময়ে আদালতের রায়ের মাধ্যমে যেন এমন বার্তাই দেওয়া হল যে, পুতিন ভিন্নমত দমন করেই যাবেন। আর এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর কোনও অধিকার নেই।

রাজনীতি বিশ্লেষক শেভটসোভা বলছেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ‘নাভালনি এবং মানবাধিকার’ নিয়ে তার গান গেয়ে যাবেন; এরপর পুতিন ‘যুক্তরাষ্ট্রও তো একইরকম’ বলে তার গান গাইবেন।"

"তবে দুই নেতার বৈঠক যখন হচ্ছেই, তখন ধরে নেওয়া যায়, মানবাধিকার নিয়ে কথা কাটাকাটির পর তারা মূল আলোচনায় চলে যাবেন, আর তা হচ্ছে, উত্তেজনা কমিয়ে আনার জন্য কিছু একটা করা।"