পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

ড্রোন হামলা চালিয়ে পানশির দখলে তালেবানকে সাহায্য করছে পাকিস্তান?

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-09-10 00:34:42 BdST

আফগানিস্তানে পানশির উপত্যকায় শেষ সশস্ত্র প্রতিরোধটুকুও গুঁড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা আরও সুসংহত করতে চাইছে তালেবান।

আর এই প্রচেষ্টায় পাকিস্তান তালেবানবিরোধী বাহিনীকে নিশানা করে ড্রোন হামলা চালিয়ে তালেবানকে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পাকিস্তান এমন অভিযোগ অস্বীকার করলেও এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে বিবিসি:

ড্রোন হামলা নিয়ে অভিযোগগুলো কী?

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের উত্তর-পূর্বের পানশির উপত্যকায় তালেবানবিরোধী বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে তালেবান যোদ্ধারা। এই একটি প্রদেশেই তালেবানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ টিকে আছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বরে তালেবান পানশির দখলে নেওয়ার দাবি করে জয় ঘোষণা করলেও সেখানকার তালেবানবিরোধী প্রতিরোধ বাহিনী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে তারা তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তালেবানকে সহায়তা করতে পানশিরের তালেবান-বিরোধীদের নিশানা করে ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

ছবি: রয়টার্স

ছবি: রয়টার্স

গত রোববারই পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র ড্রোন নামানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আফগান এক সাংবাদিক তাজউদ্দীন সোরেশ বলেছেন, "পাকিস্তান ড্রোন দিয়ে আফগানিস্তানের পানশির উপত্যকায় বোমা হামলা চালিয়েছে বলে তাকে জানিয়েছেন খোদ পানশিরের গভর্নর কামালউদ্দিন নিজামি।"

আরও অনেকেই আকাশপথে পানশিরে আক্রমণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন; যা থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তানেরই কেবল এই হামলা চালানোর সক্ষমতা ছিল। ড্রোন হামলার এই বিষয়টি স্যোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে। বলা হচ্ছে, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয়ে পাকিস্তান যে হস্তক্ষেপ করছে- এ তারই প্রমাণ।

ইরানি ও ভারতীয় গণমাধ্যমও পানশিরের যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সামরিক হার্ডওয়্যার ব্যবহারের ছবি দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রমাণস্বরূপ দেওয়া এই ছবিগুলো বিভ্রান্তিকর।

পাকিস্তান এবং তালেবান উভয়ই এইসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র, জেনারেল বাবর ইফতিখার বিবিসি-কে বলেছেন, এগুলো ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ এবং এসবই ‘ভারতের অযৌক্তিক প্রচারণা।’

তিনি বলেন, "আফগানিস্তানের ভেতরে যা ঘটছে তার সঙ্গে পাকিস্তানের কোনও সম্পর্ক নেই, সেটি পানশির হোক বা অন্য কোথাও হোক।"

যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো অতীতে অনেকবারই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবানকে সাহায্য করার অভিযোগ করেছে। তবে তা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দারা আফগানিস্তানে তালেবানের মতো কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা রেখেছে।

ছবি: ইউটিউব ভিডিও

ছবি: ইউটিউব ভিডিও

পাকিস্তানের কি নিজস্ব ড্রোন আছে?

হ্যাঁ, পাকিস্তানের নিজস্ব ড্রোন (চালক বিহীন বিমান) আছে।

২০১৫ সালের মার্চে পাকিস্তান প্রকাশ্যেই এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, নিজ ভূখন্ডে আদিবাসী অঞ্চল উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তৎপর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে তারা ড্রোন ব্যবহার করছে।

সেই অভিযানে পাকিস্তান দেশে নির্মিত বুরাক ড্রোন ব্যবহার করেছিল। এই ড্রোন আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য লেজার-গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম। পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড সায়েন্টিফিক কমিশন’ ড্রোনটি তৈরি করেছে।

তাছাড়া, তুরস্ক বা চীন কিংবা উভয়ের সহায়তায় পাকিস্তান দূর পাল্লার ড্রোন সংগ্রহ করেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। গত বছর চীনের তৈরি উইং লুং-২ ড্রোন পাকিস্তান কিনেছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল।

এই ড্রোন লিবিয়ার সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ব্যবহার করেছে বলে তথ্য বেরিয়ে আসে বিবিসি’র এক তদন্তে।

এছাড়া, চীনের তৈরি সিএইচ-ফোর ড্রোনও পাকিস্তান কিনেছে বলে আরও নানা খবর পাওয়া গেছে।, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং হামলা চালানো- দুই কাজেই ব্যবহার করা যায়। এসব ড্রোন ব্যবহার করেই ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে সৌদি আরব।

চীনের তৈরি সিএইচ-ফোর ড্রোন কয়েক ধরনের হয়। কোনোটা ব্যবহার হয় নজরদারির জন্য, আবার কোনোটি ব্যবহার হয় বিস্ফোরক বহনের জন্য। আকাশে অবস্থানের সময়ের ক্ষেত্রেও এই ড্রোনগুলোর ভিন্নতা আছে।

এই ধরনের ড্রোনের কোন সংস্করণটি পাকিস্তানের কাছে আছে এবং সেটি কার্যকর রয়েছে কিনা তা স্পষ্ট জানা যায়নি। পাকিস্তানের কর্মকর্তারাও দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন তাদের হাতে থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

পাকিস্তানের হাতে আরও আছে শার্পার-২ ড্রোন। এই ড্রোন ১৪ ঘণ্টা আকাশে উড়তে পারে এবং অস্ত্রও বহন করতে পারে। এছাড়াও অন্য আরও ড্রোন পাকিস্তানের আছে। তবে সেগুলো মূলত নজরদারির কাজে ব্যবহার হয় এবং সেগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায় না।

আফগানিস্তানে কি ড্রোন হামলা করেছে পাকিস্তান?

এ মুহূর্তে এই দাবির ক্ষেত্রে কোনও অকাট্য প্রমাণ নেই। পাকিস্তানের এমন ড্রোন হামলার চালানোর কোনও মানে হয় কিনা তা নিয়েও কিছুটা সংশয় আছে।

বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানের ড্রোন প্রকল্পের ওপর নজরদারি করে আসা তদন্তকারীরা সম্প্রতি পাকিস্তানে সিএইচ-ফোর ড্রোনের একটি ছবি প্রকাশ করেছেন।

গুগল আর্থের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে এ বছরের ১২ই জুলাইয়ে বাহাওয়ালপুরের কাছের একটি বিমান ঘাঁটিতে চারটি ড্রোন চিহ্নিত করা হয়েছে।

ছবি: বিবিসি

ছবি: বিবিসি

তবে এ চিত্র থেকে পাকিস্তানের ড্রোন সক্ষমতার ব্যাপারে ধারণা পাওয়া গেলেও এইসব ড্রোন যে পানশির উপত্যকায় ব্যবহার করা হয়েছে তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না।

লন্ডন-ভিত্তিক ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’ এর গবেষক জাস্টিন ব্রঙ্ক অবশ্য ড্রোনগুলোর ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন।

তিনি বলেন, চীনের তৈরি সিএইচ-ফোর দিয়ে দূরপাল্লার নিশানা চিহ্নিত করতে চীন পরিচালিত স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয়। সেক্ষেত্রে পাকিস্তান নিজেদের সীমান্তের বাইরে কোনও অভিযান চালাতে চাইলে তাতে চীনের সম্মতি দেওয়ার কথা নয়।

তবে ব্রঙ্ক বলেন, "এমন পরিস্থিতিতে সিএইচ-ফোর ড্রোন ব্যবহারের জন্য একটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে এর সঙ্গে সরাসরি লাইন-অব-সাইট রেডিও কন্ট্রোল সংযোগ স্থাপন করার প্রয়োজন পড়বে। পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে দূরে অবস্থিত দুর্গম অঞ্চলে ড্রোন ব্যবহারের জন্য এমন সংযোগ স্থাপন করা খুবই কঠিন। তবে তা অসম্ভব নয়।"

কিন্তু এমন একটি সময়ে আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের লাভ কী তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

ড্রোন হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের লাভ কী?

ইসলামাবাদ-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ড. মারিয়া সুলতান বলেন, "পাকিস্তানের ড্রোন সক্ষমতা আছে কি নেই সে প্রশ্ন বিবেচনায় নিলেও এই ধরনের (ড্রোন) হামলা চালানোর কোনও কৌশলগত লাভ আছে বলে তো মনে হয় না।"

তাছাড়া, আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ে এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাই এই সময়ে সেখানে পাকিস্তানের সরাসরি হস্তক্ষেপ করাটা কৌশলগত দিক থেকে অর্থবহ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ব্রিটিশ গবেষক জাস্টিন ব্রঙ্কও।