২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬

ফাইনালের আগে রোমাঞ্চিত বাংলাদেশের সাবেক কোচ

  • লন্ডন থেকে আরিফুল ইসলাম রনি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-07-13 23:09:58 BdST

bdnews24

লর্ডসের মূল মাঠ থেকে পাশেই নার্সারি গ্রাউন্ডের নেটের দিকে যাচ্ছিলেন ট্রেন্ট বোল্ট, ম্যাট হেনরি। ঠিক পেছনেই তাদের বোলিং কোচ শেন জার্গেনসেন। পরিচিত বাংলাদেশের সংবাদকর্মী দেখেই তার মুখে খেলে গেল হাসি। বাংলাদেশের সাবেক কোচ মনে রেখেছেন এখনও। এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন কুশলাদি। ‘বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে যাচ্ছেন, কেমন লাগছে?’ প্রশ্ন শুনে ভ্রু নাচিয়ে, অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে বললেন, “রিডিকিউলাস...!”

বাংলাদেশের সাবেক বোলিং কোচ, পরে যাকে করা হয়েছিল দলের প্রধান কোচ, এবারের বিশ্বকাপে তিনি নিউ জিল্যান্ডের বোলিং কোচ। টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত চরিত্রও। বিশ্বকাপ জুড়ে অসাধারণ বোলিং করেছেন নিউ জিল্যান্ডের পেসাররা। বিশেষ করে সেমি-ফাইনালে ভারতের বিখ্যাত টপ অর্ডার যেভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন তারা, সেটির কৃতিত্ব কিছুটা তো বোলিং কোচেরও!

জার্গেনসেন মজা করে বললেও আসলে অনুভূতিটা ‘অদ্ভুত’ রকমই হওয়ার কথা। বিশ্বকাপের ফাইনাল, ওয়ানডে ক্রিকেটে শ্রেষ্ঠত্বের হাতছানি, নিজের জায়গায় তার সাফল্য, প্রথমবার বিশ্বকাপের ট্রফি ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষা, হতে পারে স্বপ্নভঙ্গও। সব অনুভূতি মিলিয়ে ভেতরে জট পাকানোর কথা।

তবে মজাটুকু শেষে একটি অনুভূতির কথা আলাদা করেই বললেন জার্গেনসেন। নিউ জিল্যান্ড টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেললেও তার প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে কিউইদের বোলিং কোচ জানালেন, রোমাঞ্চের দোলা টের পাচ্ছেন প্রবলভাবেই।

“প্রচণ্ড রোমাঞ্চিত আমি। এই অনুভূতির তুলনা নেই। আমার দেশ (অস্ট্রেলিয়া) ৫ বার বিশ্বকাপ জিতেছে। কিন্তু নিউ জিল্যান্ডে এত বছর ধরে কাজ করছি, দেশটি অনেক আপন হয়ে গেছে। ওদের সঙ্গে ওদের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলেছি, খুব উপভোগ করছি।”

ভারতের সঙ্গে রিজার্ভ ডেতে গড়ানো সেমি-ফাইনাল শেষ হওয়ার পর থেকেই বিচিত্র সব অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে তার।

“সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম দুই দিনব্যাপী সেমি-ফাইনাল খেললাম আমরা! বিশ্বাস ছিল যে আমাদের ছেলেরা পারবে। আমাদের পেসারদের সামর্থ্যে আস্থাও ছিল। এরপরও যখন জিতেই গেলাম, ফাইনালে উঠেছি এটা হজম হতে একটু সময় লেগেছে। বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা! দলের টানা দ্বিতীয় ফাইনাল, ছেলেরা স্বাভাবিকভাবেই খুবই রোমাঞ্চিত।”

এই দফায় নিউ জিল্যান্ডের বোলিং কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই সময়ের বোলিং কোচ দিমিত্রি মাসকারেনহাস চলে যাওয়ার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত বোলিং কোচের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেই বছরের নভেম্বরে পাকাপাকি দায়িত্ব পান ২০১৯ সালের শেষ পর্যন্ত। বোলিং কোচ হিসেবে কতটা সফল, সেটি বলে দিচ্ছে এবারের আসরে বোল্ট, হেনরি, লকি ফার্গুসনদের পারফরম্যান্স।

এর আগে ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্তও কিউইদের বোলিং কোচ ছিলেন সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান পেসার। ২০১১ সালের অক্টোবরে বোলিং কোচ হিসেবে শুরু হয় তার বাংলাদেশ অধ্যায়। পরের বছরের অক্টোবরে প্রধান কোচ স্টুয়ার্ট ল আচমকা দায়িত্ব ছেড়ে দিলে জার্গেনসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান কোচের দায়িত্ব দেয় বিসিবি।

তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওয়ানডে সিরিজে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সেটির পুরষ্কারও মেলে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত থেকে তাকে করা হয় মূল কোচ। বাংলাদেশ সেই বছরই ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করে নিউ জিল্যান্ডকে (৩-০), ড্র করে টেস্ট সিরিজ।

তবে ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে গুঞ্জন ওঠে। ভবিষ্যত অনেকটা আঁচ করতে পেরে নিজে থেকেই পদত্যাগ করেন তিনি। বিসিবিও ছেড়ে দেয় আপত্তি ছাড়া।

এরপর ফিজির কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ বিশ্বকাপে ছিলেন স্কটল্যান্ডের বোলিং পরামর্শক। এই বছরই বিপিএলে আসেন রংপুর রাইডার্সের কোচ হয়ে। এরপর থেকে নিউ জিল্যান্ডের বোলিং কোচ হিসেবে চলছে তার সফল পথচলা।

বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেও এখনও তার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে এই দেশ। নিয়মিতই অনুসরণ করেন বাংলাদেশের খেলা। এই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দেখেও জানালেন ভালো লাগার কথা। তার চোখে ধরা পড়া ঘাটতিটুকুও তুলে ধরলেন।

“বাংলাদেশ বেশ ভালো খেলেছে। অষ্টম হওয়াটা আসলে সবটুকু ফুটিয়ে তুলছে না। একটু এদিক-সেদিক হলেই বাংলাদেশ আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারত। আমাদের সঙ্গে (নিউ জিল্যান্ড) দারুণ লড়াই হয়েছে; ম্যাচটি জিততে পারলে হয়ত ওরা সেমি-ফাইনালেও খেলতে পারত।”

বাংলাদেশকে নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও সাকিবের পারফরম্যান্সে মুগ্ধতার কথা জানালেন নিজে থেকেই।

“কী অসাধারণ ব্যাটিংই না করেছে সাকিব! আমি যেখানে দেখেছিলাম, সেখান থেকে অনেক পরিণত ও কর্তৃত্বময় হয়ে উঠেছে আরও। মনে হচ্ছিল, ওকে তো আউটই করা যাবে না! কখনও কখনও মনে হচ্ছিল, ওর সামনে বোলাররা যেন টেনিস বলে বোলিং করছে। বোলারদের এতটাই অসহায় মনে হয়েছে ওকে বোলিংয়ে। সাকিব এই ফর্ম ধরে রাখতে পারলে, বাংলাদেশ দলের জন্য দারুণ সময় অপেক্ষা করছে।”

আর নিউ জিল্যান্ডের জন্য? ফাইনালে কি অপেক্ষায়? যেতে যেতে জার্গেনসেন বলে গেলেন, “আশা করি, দিনটি হবে আমার জীবনের সেরা দিন।”


ট্যাগ:  জার্গেনসেন  নিউ জিল্যান্ড  ক্রিকেট বিশ্বকাপ