২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গাইবান্ধায় বন্যার পানি কমলেও বাড়ছে দুর্ভোগ

  • গাইবান্ধা প্রতিনিধি. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-07-22 13:20:49 BdST

bdnews24

গাইবান্ধায় বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও বাড়ছে দুর্ভোগ; বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল। জেলার প্রায় সাড়ে তিনশর বেশি গ্রামের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ এখনও পানিবন্দি হয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান,গত চব্বিশ ঘন্টায় তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ২৬ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ঘাঘটের পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার এবং করতোয়ার পানি ১ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কিন্তু জেলার ২১টি এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেঙ্গে যাওয়ায় এখনও একাধিক গ্রামে পানি ঢুকে পড়ছে বলে জানান তিনি।

জেলা ত্রাণ ও পুর্ণবাসন কার্যালয় বলছে, বন্যায় এ পর্যন্ত জেলার সাতটি উপজেলার দুইটি পৌরসভাসহ ৫১টি ইউনিয়নের ৩৯০টি গ্রামের ৫ লাখ ১৪ হাজার সাড়ে ৮৯ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। যাদের ৪৫ হাজার ৪৯৫টি বসতবাড়ি পানির নিচে। পানিবন্দি ৭৪ হাজার ১৬৯ লোক জেলার ১৮৪টি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।

এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৭৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, ২৩৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ৬৩ কিলোমিটার বাঁধ ও ২১টি কালভার্ট। ডুবে গেছে হয়েছে ১১ হাজার ৯২৮ হেক্টর বিভিন্ন ফসলি জমি।

পানিতে ঢুকে পড়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৪০৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভেসে গেছে ৬ হাজার ৬৫৮টি পুকুরের মাছ। ডুবে গেছে হয়েছে ৯ হাজার ২২৪ টি টিউবওয়েল। বন্যা কবলিত এলাকায় কাজ করছে ৭৫টি মেডিকেল টিম।

এদিকে ফুলছড়ি উপজেলার কৈতকিরহাট এলাকায় শুক্রবার রাতে প্রায় একশত মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাটসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে দেবে গেছে। শনিবার রাতে গোবিন্দগঞ্জের হরিরামপুর ইউনিয়নের নয়াপড়া এলাকায় বাঙ্গালী নদীর বাঁধ ভেঙ্গে নতুন করে আরও পাঁচ হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে।

এছাড়া গাইবান্ধা শহরেরও অধিকাংশ রাস্তাঘাট, প্রধান দুটি কাঁচাবাজার, বিপনী বিতান, সরকারি বেসরকারি একাধিক অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও পানিতে তলিয়ে আছে।

বাঁধ, সড়ক, নৌকায় ও উঁচু স্থানসহ ১৮৪টি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষ খাদ্য, সুপেয় পানি ও শৌচাগার সমস্যায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন তারা গবাদি পশু নিয়ে। অপরদিকে পাঁচদিন যাবত রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে।

জেলা শহরের সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গাইবান্ধা-বালাসি সড়কেও যানবাহন চলাচল বন্ধ।

রোববার ফুলছড়ির কৈতকিরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বানভাসি মানুষগুলো ভেঙ্গে যাওয়া ওই বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, বাঁধ ভাঙ্গার শব্দে হঠাৎ ঘুমন্ত মানুষজন জেগে উঠে কোনোমতে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেয়। তবে বানের পানিতে ভেসে গেছে ঘরের জিনিসপত্র।

এখন পর্যন্ত স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তা তাদের খোঁজখবর নেননি বলে অভিযোগ করেন তারা। 

কৈতকিরহাট কৃষক ইয়াদ আলী বলেন, বৃহস্পতিবার বিকালে কৈতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনের বাঁধের একটি ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি ঢুকছিল। এ সময় এলাকাবাসী বালির বস্তা ও পল (খড়) দিয়ে গর্তটি বন্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে কোনো সুরাহা না হলে হাল ছেড়ে দেয়।

“এরপর হঠাৎ রাত ১টার দিকে প্রচণ্ড শব্দে বাঁধটি ধসে যায়। দোতলা স্কুলভবনটিসহ আশপাশের দোকানপাট ও দুই শতাধিক ঘরবাড়ি মুহূর্তে মাটিতে দেবে যায়। গ্রামের বাসিন্দারা কোনোমতে নিজের

জীবন নিয়ে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাঁধের ওপর আশ্রয় নেয়। গ্রামের ঘরবাড়ি গুলো পানির তোড়ে ভেসে যায়।”

ওই বাঁধে আশ্রিত নুরু মিয়া বলেন, “এখানে ছেলে মেয়ে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ পাইনি।”

গাইবান্ধা সদরের খোলাহাটির সুমন কুমার বর্ম্মন বলেন,“পানি কমতে শুরু করলেও বাঁধর ভাঙ্গা অংশ দিয়ে তাদের গ্রাম ও ঘাঘোয়া গ্রামে এখনও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

এদিকে সুপেয় পানির ব্যাপক সংকটে পড়েছেন বাঁধে আশ্রিত বানভাসিরা। গতকাল ফুলছড়ি কঞ্চিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি বেসরকারি সংগঠন রিকশাভ্যানে করে পানির ট্যাংক থেকে বাঁধে আশ্রিত বানভাসিদের পানি সরবরাহ করছেন। আর বানভাসিরা লাইনে দাড়িয়ে সেই পানি নিজ নিজ পাত্রে নিচ্ছেন।

ওই বাঁধে আশ্রিত ওমিছা বেগম বলেন, “খাবার না দিলেও খাবার পানি দেওয়ার কথা পত্রিকাত লেখেন বাহে। চারদিকে এত পানি তারপরও পানির তেষ্ঠায় (তৃষ্ণায়) গলা শুকিয়া কাঠ হয়ে গ্যাছে।”

ফুলছড়ির হাজিরহাট বাঁধে আশ্রিত আজিজ মিয়া বলেন, “বেটা ছোল আর ছোট ছোলগুলা যেটি সেটি পায়খানা-প্রসাব করব্যার পারে, কিনতো হামারঘরে মহিলারা বিপদোত পড়ছে।”

বানভাসি ফুলছড়ির ভাজনডাঙ্গা গ্রামের দিনমজুর আমজাদ মিয়া (৫০) বলেন, “উপজেলাত থাকি হামারঘরে গাও অনেক দূরোত। নাওয়োত আসতে তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগে। তাই কাউয়ো আসপার চায় না। সগলে খালি উচে জায়গাত আসি ইলিপ দিয়া যায়।”

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান জানান, তার উপজেলার তিনটি এলাকায় বাঁধ ধসে সাতটি ইউনিয়নের ২১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

গাইবান্ধা রেলস্টেশন মাস্টার আবুল কাশেম জানান, সান্তাহার-লালমনিরহাট রেলরুটের গাইবান্ধা সদরের বাদিয়াখালি থেকে ত্রিমোহিনী পর্যন্ত রেল পথের প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশ ডুবে গিয়ে কিছু স্থানে স্লিপার, পাথর ও মাটি সরে যাওয়ায় গত বুধবার থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে আছে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাইবান্ধার বোনারপাড়া রেলস্টেশন থেকে সান্তাহার এবং গাইবান্ধা রেলস্টেশন থেকে লালমনিরহাট ও দিনাজপুরের মধ্যে ট্রেন চলাচল করছে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন বলেন, “বন্যা কবলিত উপজেলাগুলো জেলা ত্রাণ ভণ্ডার থেকে ১ হাজার মেট্রিকটন চাল ও ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৬ হাজার কার্টন শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”

এরমধ্যে এখন পর্যন্ত ৫৮৫ মেট্রিকটন চাল, নগদ ৯ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ৫৫০ কার্টন শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। 


ট্যাগ:  রংপুর বিভাগ  গাইবান্ধা জেলা