১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বুলবুল মোকাবিলার প্রস্তুতি উপকূলে

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-11-08 20:25:44 BdST

bdnews24

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বাংলাদেশের স্থলভাগের দিকে ধেয়ে আসছে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য উপকূলীয় জেলাগুলোয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা জানিয়েছেন।

বুলবুল শক্তি সঞ্চয় করে শুক্রবার সকালে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। বিকালে ঝড়ের গতি আরও বেড়ে যাওয়ায় ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া দপ্তর।

ঝড়ে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল থেকেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অধিকাংশ এলাকায় বিরাজ করছে মেঘলা আবহাওয়া, কোথাও কোথাও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

বাগেরহাট

বাগেরহাটে শুক্রবার এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি সভায় জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, তারা ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জেলার ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে প্রায় সোয়া দুই লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়া জেলার সব উপজেলায় একটি করে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

“সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। উপকূলের মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে সেচ্ছাসেবকরা প্রস্তুত রয়েছেন। সুন্দরবনে নতুন করে কাউকে যাওয়ার অনুমতি না দিতে বলা হয়েছে।”

এছাড়া দুবলাচরে রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

রাস উৎসক কমিটির সহ-সভাপতি বাবুল সরদার বলেন, “১০ নভেম্বর থেকে সুন্দরবনের দুবলারচরের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রাস উৎসব শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই দিন ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আসার শঙ্কা রয়েছে। এজন্য আমরা রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করেছি।”

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে সকাল থেকে আকাশ মেঘলা রয়েছে, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।

বাগেরহাটের মোংলা সমুদ্র বন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া দপ্তর।

প্রস্তুতি সভায় পুলিশ সুপার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, কোস্টগার্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, কৃষি অফিস, আবহাওয়া অফিস, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা, স্কাউটস, রেড ক্রিসেন্ট সদস্য, এনজিওর প্রতিনিধিরা ছিলেন।

ভোলা

ভোলায় সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ভারী বৃষ্টিও হয়েছে। পুরো জেলা মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। নদী ও সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। অনেক জেলে তীরে চলে এসেছেন।

ঘুর্নিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি বিষয়ক সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক বলেন, সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে একটিসহ ও সাত উপজেলায় সাতটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এখান থেকে সবাই সার্বক্ষণিক ঘূর্ণিঝড় বিষয়ক সেবা নিতে পারবে।

“জেলার ৬৬৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সিপিপি, রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসসহ মোট ১৩ হাজার সেচ্চাসেবী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগের সময় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় চাল, টিন ও টাকাসহ পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী রয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।”

ঝড়ের বিষয়ে মানুষকে জানাতে সিপিপি ও রেডক্রিসেন্ট কর্মীরা প্রচার-প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভোলা সিপিপির উপ-পরিচালক মো. সাহাবুদ্দিন।

সিপিপির ১০ হাজার ২০০ সেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।

খুলনা

খুলনায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

শুক্রবার বিকাল ৪টায় খুলনা সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় খুলনায় ৩৪৯টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও নয়টি উপজেলায় মোট ১৯টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

“স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার জন্য জেলার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় দুপুর থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১২ নভেম্বর সুন্দরবনের দুবলার চরে অনুষ্ঠেয় রাসমেলায় যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।”

সাইক্লোন প্রিপেয়ারডনেস প্রোগ্রাম (সিপিপি) কর্মীরা প্রস্তুত রয়েছেন বলে তিনি জানান।

সকাল থেকেই খুলনার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। দুপুর থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দিন বলেন, “মোংলা বন্দরে অবস্থানরত ১৪টি বিদেশি জাহাজে মালামাল বোঝাই ও খালাসের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে।”

পটুয়াখালী

বুলবুলের প্রভাবে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় জেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে শুক্রবার সকালে জেলা প্রশাসকের দরবার হলে এক জরুরি সভায় জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জেলায় মোট ৪০৩ টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সার্বিক বিষয় মনিটরিং করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এছাড়া সব উপেজলায় একটি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

“দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০০ মেট্রিকটন চাল, দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ১৬৬ বান্ডিল টিন ও ৩৫০০টি কম্বল মজুদ রাখা হয়েছে।”

এদিকে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কুয়াকাটাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করছেন বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা।

টানা তিন দিনের ছুটি থাকায় কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটকরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন। বেলা ১২টার দিকে ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করার পর পর্যটকরা তড়িঘড়ি করে যে যার মত করে গন্তব্যের জন্য স্থান ত্যাগ করেছেন।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মুনিবুর রহমান জানান, উপজেলার সকল আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখাসহ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক রাখতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকার সকল ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রেখে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। উপজেলা পরিষদে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৬টায় বিভাগীয় কমিশনারের উপস্থিতিতে জরুরি সভা হবে। তিনি দিকনির্দেশনা দেবেন। সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

কুয়াকাটা-আলীপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আনছার উদ্দিন মোল্লা জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হওয়ায় সমুদ্র থেকে সকল মাছ ধরা ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মৎস্য বন্দর আলীপুর, মহিপুর, ঢোস, মৌডুবি শিববাড়িয়া নদসহ বিভিন্ন পোতাশ্রয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আসতে শুরু করেছে।

দেখা গেছে, উপকূলের মানুষের মাঝে ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পায়রা বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. মহিউদ্দিন খান জানান, শুক্রবার বেলা ১২টার মধ্যে সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন বন্দরে কোনো জাহাজ নেই। ১২টি টাগবোট রয়েছে। তাদের এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই। শনিবার ইন্দোনেশিয়া থেকে একটি জাহাজের কয়লা নিয়ে আসার কথা ছিল। তাদের আসতে নিষেধ করা হয়েছে।

বন্দরের ১৯০ জন কর্মচারীর সবাইকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

সাতক্ষীরা

বুলবুলের প্রভাবে সাতক্ষীরার আবহাওয়া থমথমে রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে হচ্ছে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। শুক্রবার সকাল থেকে হালকা শীতের মধ্যে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিপাতে ঠাণ্ডা বেড়েছে সামান্য।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বদিউজ্জামান বলেন, আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। প্রস্তুতি সভায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জেলার শ্যামনগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, তারা প্রস্তুতি সভা করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য উপকূলের সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


ট্যাগ:  ভোলা জেলা  সাতক্ষীরা জেলা  খুলনা বিভাগ  খুলনা জেলা  বরিশাল বিভাগ  পটুয়াখালী জেলা  বাগেরহাট জেলা