লাল ও হলুদ পেঁপের সুমিষ্ট উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন

  • আবুল হোসেন, গাজীপুর প্রতিনিধি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-09-20 23:41:20 BdST

bdnews24

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সুমিষ্ট লাল ও হলুদ পেঁপের দুইটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স ও প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগের একদল গবেষক এই পেঁপে উদ্ভাবন করেন।

গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক নাসরীন আক্তার আইভী বলেন, ফলন ও পুষ্টিমান বেশি হবে- এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পাঁচ বছর গবেষণার পর তিনি সুস্বাদু ফল ও সবজি পেঁপের এমন দেশীয় জাত উদ্ভাবন করেছেন।

তিনি বলেন, পেঁপের জাত দুইটির গাছ স্ত্রী ও উভয়লিঙ্গ বিশিষ্ট হবে। প্রতিটি গাছেই ফল ধরবে। প্রতিটি গাছে ৫০-৬০টি ফল হয়। স্ত্রী গাছের ফলের আকার নাশপাতি আকারের এবং গায়ে লম্বালম্বি দাগ আছে। ফলন হয় হেক্টর প্রতি ৬০-৭০ টন, এ জাতের পেঁপেতে পেপেইন নিঃসরণ বেশি হয়। পাকা ফলের মিষ্টতা বেশি, পাকা ফলের ভিতরের রং একটিতে গাঢ় হলুদ থেকে গাঢ় কমলা রঙের, অপরটিতে লাল রংয়ের।

পাকা পেঁপেতে যেমন প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ ও সি থাকে তেমনি কাঁচা পেঁপেতে রয়েছে হজমকারী দ্রব্য পেপেইন, যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্যও খুব উপকারী; কাঁচা পেঁপে সবজি হিসাবেও খাওয়া যায় বলে তিনি জানান।

নাসরীন আক্তার বলেন, এ জাতের বীজ জানুয়ারিতে বপন করা হয় এবং মার্চে উৎপাদিত চারা রোপনের উত্তম সময়। চারা লাগানোর ৬০/৭০ দিনের মধ্যে ফল ধরে। এ জাতের পেঁপেতে রোগ প্রতিরোক্ষমতা অনেক বেশি। 

পেঁপে একটি পরপরাগায়িত ফল এবং পেঁপের ৩২ লিঙ্গের গাছ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পুরুষ, স্ত্রী ও উভয় লিঙ্গের গাছই পাওয়া যায়। এদের মধ্যে আমরা শুধু স্ত্রী ও উভয় লিঙ্গের পেঁপের জাত উন্নয়নে কাজ করছি। স্ত্রী ও উভয় লিঙ্গের পেঁপে গাছে ফল ধরে। উভয়লিঙ্গ গাছের ফল লম্বাটে হয়। প্রতিটি গাছে ৫০-৬০টি ফল হয় এবং প্রতিটি পেঁপের ওজন হয় ১.৫-৩.৫ কেজি।”  

গবেষক নাসরিন বলেন, বাণিজ্যিকভাবে চাষের ক্ষেত্রে চাষিরা পরপরাগায়িত বীজ ব্যবহার করেন। সাধারণ পেঁপের বীজ থেকে উৎপাদিত চারার ৫০ ভাগই পুরুষ গাছ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা থেকে কোনো ফল পাওয়া যায় না। তাই অধিক ফলবান গাছ পাওয়ার আশায় পেঁপে চাষিরা এক্ষেত্রে প্রতি মাদায় বা ভিটেতে ৩/৪টি চারা একত্রে রোপণ করে থাকেন। ফুল আসার পর পুরুষ গাছ কেটে বাদ দেওয়ার পরে জমিতে রাখা হয় শুধু স্ত্রী ও উভয় লিঙ্গের গাছ। পুরুষ গাছ মটি থেকে পুষ্টি ও সার গ্রহণ করায় অন্য গাছেও সার-পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। এতে একদিকে ফলন যেমন অনেক কমে যায় তেমনি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।

চাষিরা যাতে প্রতিটি মাদায় একটি মাত্র চারা রোপণ করে সব চারাতেই ফল পান এবং ফলন ও পুষ্টিমান বেশি হয়- এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তার নেতৃত্বে টানা ৫ বছর গবেষণা চালিয়ে সুস্বাদু ফল ও সবজি পেঁপের এমন দেশীয় জাত উদ্ভাবন করেছেন বলে নাসরিন জানান।  

নাসরিন জানান, দেশের ক্রমাগত কৃষিভূমি হ্রাস ও জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে ফল ও সবজি চাহিদা পূরণের বিষয়টি বিবেচনায় এনে ২০০৮ সালে পেঁপে গবেষণার কাজ হাতে নেওয়া হয়। দেশীয় পেঁপে ব্যবহার করে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু করা হয়। দেশীয় পেঁপের পরপরাগায়িত বীজ হতে চারা উৎপাদন করে প্রজনন ও জেনেটিক পিওরিফিকেশন এর মাধ্যমে।

চীন, অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানে এ ধরনের গবেষণা হয়েছে এবং সেই গবেষণার ফল কাজে লাগিয়ে চাষাবাদও হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. গিয়াস উদ্দিন মিয়া বলেন, পেঁপে হলো একটি খুব প্রিয় ফল। এর পুষ্টিমান খাদ্য নিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি পেঁপে গাছে যাতে ফলন হয় সেজন্য গবেষকরা কাজ করছেন।

“ইতিমধ্যে কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ থেকে বিইউ পেঁপে-১ ও বিইউ পেঁপে-২ নামে দুইটি পেঁপের জাত ছাড় করা হয়েছে। পরবর্তীতে উক্ত জাতগুলারে গুণগতমান ঠিক রেখে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জেনেটিক পিওরিফিকেশন করে সুপ্রিম সিড কোম্পানির মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য দেওয়া হয়।”

অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন মিয়া আরও বলেন, পেঁপে ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা লেখাপড়া করানোর পাশাপাশি এ যাবত ৬০টি বিভিন্ন শ্যস্যের জাত উদ্ভাবন করেছেন।

তিনি গবেষণার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার পাশপাশি লেখাপড়ার মান উন্নয়নের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করছেন বলে জানান উপাচার্য।