কাভার্ড ভ্যানের দুই চাকা পন্টুনে, তবুও শেষ রক্ষা হয়নি

  • গোলাম মর্তুজা অন্তু, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-10-27 16:33:15 BdST

bdnews24
কাভার্ডভ্যান চালক মোহাম্মদ সেলিম

নির্ঘুম চোখ নিয়ে, কাত হয়ে যাওয়া ফেরির আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছিলেন মোহাম্মদ সেলিম। এর মধ্যে পুলিশও কয়েকবার তাড়া দিয়েছে সরে যেতে; কিন্তু ঘাট ছেড়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই এই চালকের।

এর কারণ তিনি যে কাভার্ড ভ্যানটি চালাতেন সেটি ফেরি থেকে পড়ে নদীতে ডুবে আছে। ভ্যানটির পেছনের কিছুটা অংশ ভেসে আছে, সেটাই যেন বারবার আশা দেখাচ্ছে সেলিমকে।

বুধবার সকালে পাটুরিয়া ঘাটে এমন দুর্ভাগ্যের শিকার হতে হয়েছে যুবক এই ভ্যান চালককে। ঘাটে ভেড়ার পর ফেরি থেকে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে এ দুর্ঘটনা ঘটে। জীবন বাঁচাতে ফেরি ও পন্টুনের ঠিক মাঝখানে কাভার্ড ভ্যানটিকে রেখেই কোন রকমে নেমে যেতে হয় তাকে।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যানবাহন নিয়ে বুধবার সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয় রো রো ফেরি শাহ আমানত। পদ্মা পার হয়ে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পরপরই সেটি কাত হয়ে নদীতে উল্টে যায়।

পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা বলেছেন ওই ফেরিতে ১৭টি পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়াও কয়েকটি মোটর সাইকেল ও প্রাইভেট কার ছিল। ঘাটে ভেড়ার পর কয়েকটি গাড়ি নামতে পারলেও বাকিগুলো ফেরির সঙ্গেই ডুবে যায়। পরে কয়েকটি ট্রাক ও ভ্যানকে নদীতে ভাসতে দেখা গেছে।

আফজাল সার্ভিসেস নামে একটি সংস্থার কাভার্ড ভ্যান চালান সেলিম। সোমবার বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে রাসায়নিক নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। বুধবার সকালে দৌলতদিয়া ঘাট থেকে আমানত শাহ ফেরিতে কাভার্ডভ্যান নিয়ে উঠেন তিনি। ফেরিটি পাটুরিয়া ঘাটে এসে ভেড়ার সময়ই কাত হতে শুরু করে বলে দুর্ঘটনার মুহূর্তের বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি।

কী ঘটেছিল ফেরি শাহ আমানতে? যা বললেন দুই যাত্রী  

যানবাহন নিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে উল্টে গেছে ফেরি  

তিনটি ট্রাক ফেরি থেকে নেমে যেতে পারে। চতুর্থ পরিবহনটি ছিল সেলিমের। ডুবতে থাকা ফেরি থেকে তিনি কাভার্ডভ্যানের দুটো চাকা ঘাটের পন্টুনে তোলেন। ঠিক সেই সময়েই ফেরিটি নিচু হতে থাকলে তার গাড়িটি আটকে যায়, এক্সেলিটরে চাপ দিয়ে ঘাটে ওঠার শেষ সুযোগটিও আর থাকে না।

কোনো উপায় নাই দেখে এরপর জীবন বাঁচাতেই ভ্যান ছাড়তে বাধ্য হন এ চালক। সেলিম জানান, ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণ পর পাটাতনে পানি দেখতে পান তিনি। তখন তিনি ভেবেছিলেন হয়তো তার ট্রাকের রেডিয়েটর ফেটে পানি বেরিয়ে গেছে। হেলপারকে বলেন দেখে আসতে।

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় ৫ নম্বর ফেরিঘাটে বুধবার সকালে বেশ কয়েকটি যানবাহনসহ পদ্মায় উল্টে যাওয়া শাহ আমানত ফেরি থেকে পড়ে যাওয়া একটি কাভার্ডভ্যানকে নদীতে ভাসতে দেখা যায়। ছবি: গোলাম মর্তুজা অন্তু

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় ৫ নম্বর ফেরিঘাটে বুধবার সকালে বেশ কয়েকটি যানবাহনসহ পদ্মায় উল্টে যাওয়া শাহ আমানত ফেরি থেকে পড়ে যাওয়া একটি কাভার্ডভ্যানকে নদীতে ভাসতে দেখা যায়। ছবি: গোলাম মর্তুজা অন্তু

“হেলপার এসে জানায় রেডিয়েটর ফাটেনি, ফেরির বাম পাশ থেকে ডান পাশ পানি গড়িয়ে যাচ্ছে। তখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারি নাই।“

ফেরি ঘাটে ভেড়ার আগে তিনি ট্রাকের লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে দেখেন পেছনে অনেক পানি। ফেরির চালক সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ফেরিটি পাটুরিয়া ঘাটে ভেড়ান। দ্রুত তিনটি ট্রাক নেমে যায়। চতুর্থ ট্রাকটি ছিল তার।

সেলিমও ইঞ্জিনের সর্বশক্তি দিয়ে পন্টুনে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফেরিটি অনেকখানি ডুবে যাওয়ায় পন্টুনের সঙ্গে সেলিমের ট্রাকের ডিজেল ট্যাংক আটকে যায়। টাংক ফেটে সব তেলও পড়ে যায়। একপর্যায়ে ডুবতে থাকা ফেরির সঙ্গে সেলিমের ট্রাকের একটা অংশ ডুবে যায়। তখন হেল্পার কে নিয়ে ট্রাক ছাড়েন তিনি।

ফেরির লোকজন ও ট্রাকচালকদের মতে, ফেরিতে ১৭টি ট্রাক, একটি কার ও কয়েকটি মোটরসাইকেল ছিল। শুধু তিনটি ট্রাক নামতে পেরেছে। 

ঘটনার পর, ঘাটের ট্রলার চালক ও বিআইডব্লিউটিসির ভাসমান কারখানার লোকজন ডুবন্ত ট্রাকচালক ও লোকজনকে উদ্ধার করেন। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কেউ নিখোঁজ আছেন এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।