বেদনার ভারে অজয় রায়, যাচ্ছেন না অভিজিৎ হত্যামামলায় সাক্ষ্য দিতে

ছেলের কফিনের সামনেঅধ্যাপক অজয় রায়, যিনি বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন (ফাইল ছবি)
সন্তান হারানোর বেদনা নতুন করে মনে জাগাতে চান না বাবা অধ্যাপক অজয় রায়, তাই তিনি সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন না আদালতে; ফলে ঝুলে যাচ্ছে ছেলে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের বিচার।

চার বছর আগে প্রবাসী লেখক অভিজিৎ রায় একুশের বইমেলা থেকে বেরিয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অজয় রায় বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

হত্যাকাণ্ডের চার বছর পর গত ১৩ মার্চ ছয় জঙ্গিকে আসামি করে বহুল আলোচিত এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। গত ১ অগাস্ট আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার।

মামলায় অভিযোগের পক্ষে ৩৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। সাধারণত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।

অভিযোগ গঠনের পর গত ১১ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও তা হয়নি।

এরপর ৬ অক্টোবর পড়ে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ, সেদিনও উপস্থিত হননি বাদী অজয় রায়। ওই দিন জব্দ তালিকায় দুজন সাক্ষী আদালতে এলেও তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি, কারণ কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়নি পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়ার কারণে।

এরপর বুধবার ছিল সাক্ষ্যগ্রহণের দিন। এদিনও হাজির ছিলেন না অজয় রায়। তখন রাষ্ট্রপক্ষ সময়ের আবেদন করলে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান আগামী ২৮ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন রাখেন।

বাদীর অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ পিছিয়ে যাওয়ায় আসামি আবু সিদ্দিক সোহেলের স্বজনদের বেশ হাসিখুশি দেখা যায় আদালতে। তারা নিজেরা বলাবলি করছিলেন, সাক্ষী না এলে তো আসামিদের জন্য ‘ভালো’।

আইনজীবীরাও বলছেন, বাদীর সাক্ষ্য ছাড়া মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আসামিদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়ে যায়।

এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ট্রাইবুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অধ্যাপক অজয় রায়কে বারবার সমন পাঠানো হলেও তিনি আদালতে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

“তিনি টেলিফোনে আমাকে বলেছেন, ‘ছেলে নিহত হয়েছে, আমি মামলা করেছি, আমাকে কেন আবার আদালতে যেতে হবে ?”

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিজিৎ রায় দেশে ফিরেই হন হত্যাকাণ্ডের শিকার

পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক অজয় রায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়োন্টফোর ডটকমকে বলেন, “পুত্র হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। সাক্ষ্য দেওয়া হবে বেদনাদায়ক, যা আমি সইতে পারব না।

“আমার কাছে তদন্ত কর্মকর্তা এসেছিলেন, প্রসিকিউটরও এসেছিলেন। আমি তাদের বলেছি যে আমি আদালতে যেতে পারব না। ওরা  বলেছেন,  ‘ঠিক আছে দেখছি’।”

তবে অভিযোগ প্রমাণের জন্য বাদীর সাক্ষ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাহাঙ্গীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি নিজে যাব স্যারের (অজয় রায়) কাছে। তাকে আনার ব্যবস্থা করব।”

উগ্রপন্থিদের রুখতে তারুণ্যে ভরসা অজয় রায়ের

ক্রসফায়ার নয়, বিচার চান অজয় রায়

হত্যার বিরুদ্ধে অসহযোগে নামতে হবে: অজয় রায়  

জনগণের ঐক্য ছাড়া মৌলবাদ নির্মূল হবে না: অজয় রায়  

এই মামলার ছয় আসামি হলেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম ওরফে সাজ্জাদ ওরফে শামস্), আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে আবির ওরফে আদনান ওরফে আবদুল্লাহ, ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবী।

এদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম ছাড়া বাকি চার আসামি কারাগারে রয়েছেন। পলাতক জিয়া ও আকরামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। সেনাবাহিনীর বরখাস্ত মেজর জিয়াকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে।

মুক্তমনা ব্লগের পরিচালক অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের বছর খানেক আগে থেকে বাংলাদেশে ব্লগার, লেখক , অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের পক্ষ থেকে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্ত্রী বন্যা আহমদেকে নিয়ে দেশে ফেরার পর ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আক্রান্ত হন অভিজিৎ।

প্রকাশ্যেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, হামলাকারীদের চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান বন্যা। গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লিখে আসা অভিজিতের হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের ঝড় বয়ে যায়।

অভিজিতের পর একই কায়দায় হত্যা করা হয় আরও অভিজিতের বইয়ের প্রকাশকসহ কয়েকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষককে। যেগুলো জঙ্গিরা ঘটিয়েছিল বলে পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে।

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পরদিনই অজয় রায় শাহবাগ থানায় হত্যামামলাটি করেন। চার বছর তদন্তের পর ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ পুলিশ দেয় অভিযোগপত্র। তার পাঁচ মাস পর হয় বিচার শুরুর আদেশ।

পুরনো খবর

জিয়ার নির্দেশেই বইমেলায় অভিজিতকে হত্যা: অভিযোগপত্র  

অভিজিৎ হত্যায় আসামি হচ্ছেন জিয়া, ফারাবীসহ ৬ জন  

অভিজিৎ হত্যামামলা সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে

সিসি ক্যামেরায় অভিজিতের ‘খুনি’  

অভিজিৎ হত্যায় সন্দেহভাজনদের নতুন ভিডিও  

অভিজিৎ খুনের ‘দায় স্বীকার’ আনসারুল্লাহ জঙ্গির  

অভিজিৎ হত্যায় জিয়া-ফারাবীসহ ৬ জনের বিচার শুরুর আদেশ