ভার্চুয়াল আদালতে সাত দিনে ১৩৬০৭ জামিন

করোনাভাইরাস মহামারী সামাল দিতে দেশে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরুর পর ভার্চুয়ালি সীমিত পরিসরে চলা দেশের অধস্তন আদালত থেকে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৬০৭ বন্দি জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

গত ১২ এপ্রিল থেকে বুধবার পর্যন্ত মোট সাত কার্যদিবসে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে শুনানি করে এসব বন্দিদের জামিন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।

বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার রোধকল্পে গত ১২ এপ্রিল থেকে সারাদেশে অধঃস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে জামিন আবেদন ও অতীব জরুরি ফৌজদারি দরখাস্ত শুনানি ভার্চুয়ালি হচ্ছে।

“গতকাল (বুধবার) পর্যন্ত সাত কার্যদিবসে ২৩ হাজার ৭৮৪টি মামলায় ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে মোট ১৩ হাজার ৬০৭ জন হাজতী ব্যক্তি জামিনপ্রাপ্ত হয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন।”

এর মধ্যে গত ১২ এপ্রিল এক হাজার ৬০৪ জন, ১৩ এপ্রিল তিন হাজার ২৪০ জন, ১৫ এপ্রিল দুই হাজার ৩৬০ জন, ১৮ এপ্রিল এক হাজার ৮৪২ জন, ১৯ এপ্রিল এক হাজার ৬৩৫ জন, ২০ এপ্রিল এক হাজার ৫৭৬ জন ও ২১ এপ্রিল অর্থাৎ বুধবার এক হাজার ৩৪৯ জন জামিন পেয়েছেন বলে জানান হাই কোর্ট বিভাগের এ বিশেষ কর্মকর্তা।

ভার্চুয়াল আদালতের প্রেক্ষাপট

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিস্তার ঠেকাতে সরকার প্রথম দফায় গত ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে শপিং মল, দোকান-পাট, হোটেল-রেস্তারাঁসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি গণপরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

ওইদিন রাতেই সীমিত পরিসরে দেশের আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত আসে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের কাছ থেকে।

বিচার বিভাগ প্রধানের আদেশে এ সংক্রান্ত আলাদা তিনটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

এসব বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৬ এপ্রিল থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে শুধু আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত, হাই কোর্টের চারটি বেঞ্চ চালু থাকবে।

আর মুখ্য বিচারকি হাকিম বা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত সীমিত পরিসরে চালু থাকবে, তবে সব অধস্তন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

এরপর গত ১৩ এপ্রিল আরেক বিজ্ঞপ্তিতে ভার্চুয়ালি সীমিত পরিসরে আপিল বিভাগের বিচারকাজ পরিচালনার কথা জানানো হয়।

এর আগের দিন অর্থাৎ গত ১২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সর্বাত্মক বিধিনিষেধ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যেটিকে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ বলা হচ্ছে।

এ সময়ে ১৩টি নির্দেশনা দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

এর আগে গত বছর মার্চে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের সব আদালতেও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ওই সময় দেশের বিচার ব্যবস্থা কার্যত বন্ধ ছিল।

পরে সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্য বা যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় দিতে পক্ষদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আদালতকে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়ে গত বছর ৯ মে অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

এরপর ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট ভিডিও কনফারেন্সসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘প্র্যাকটিস’ নির্দেশনা জারি করে। পরদিন দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি কমতে থাকলে প্রথমে কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরীক উপস্থিতিতে নিম্ন আদালত চালু করা হয়।

এক পর্যায়ে শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে হাই কোর্টেও চালু করা হয় কয়েকটি বেঞ্চ। পাশাপাশি ভার্চুয়াল আদালতও চালু থাকে।

তবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগ এবং চেম্বার আদালত তখন থেকেই ভার্চুয়াল প্লাটফর্মেই চলছে।

দু’টি নতুন বেঞ্চ ও এখতিয়ার পরিবর্তন

মহামারী পরিস্থিতির কারণে সীমিত পরিসরে চলা উচ্চ আদালতে আরও দুটি দ্বৈত (ভার্চুয়াল) বেঞ্চ যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া একটি বেঞ্চের বিচারিক এখতিয়ার পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।

বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ গঠনসংক্রান্ত আদেশটি প্রকাশ করা হয়। বৃহস্পতিবার থেকে এসব বেঞ্চ ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিচারকাজ পরিচালনা করবে।

নতুন দুটি দ্বৈত বেঞ্চ বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান এবং বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।

আর বিচারকাজ চালিয়ে আসা বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের ভার্চুয়াল বেঞ্চটির বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তন করা হয়েছে।

গত ৬ এপ্রিল থেকে থেকে একটি একক বেঞ্চসহ মোট চারটি বেঞ্চে বিচারকাজ চলে আসছিল। বৃহস্পতিবার থেকে তার সাথে আরও দু’টি যুক্ত হয়ে হাই কোর্টে এখন ভার্চুয়াল বেঞ্চ দাঁড়িয়েছে ছয়টি।