কুমিল্লার ঘটনা ‘চক্রান্তকারীর’ কাজ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। ফাইল ছবি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে দুর্গা পূজার মণ্ডপে হামলার পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ রয়েছে বলেই প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সামনে এ মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “সভায় দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর এই সভা মনে করছে, তদন্ত হওয়ার আগে আমরা মনে করছি, আমরা সিদ্ধান্তে আসিনি, আমরা শতভাগ নিশ্চিত নই, আমরা মনে করছি, এটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল, কোনো ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারীর কর্ম এটা। আমরা তদন্ত শেষে আপনাদের সব ঘটনা জানাতে পারব।”

বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা চলার মধ্যেই বুধবার সকালে কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার কথিত অভিযোগ নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে তারা তোপের মুখে পড়ে, বাঁধে সংঘর্ষ।

এর জের ধরে চাঁদপুরেও পূজা মণ্ডপে ভাংচুর ও সংঘর্ষ হয়, সেখানে প্রাণহানিও ঘটে। মণ্ডপে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও কর্ণফুলী উপজেলা, কক্সবাজারের পেকুয়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জেলায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কুমিল্লার পূজা মণ্ডপে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’ কীভাবে ঘটল, তা বের করতে ‘সাথেসাথেই’ কাজ শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

“এই ঘটনা সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সব জায়গায় চলে যায়। হৃদয় বিদারক কিছু ঘটনাও ঘটেছে। চাঁদপুরে নিষ্পাপ মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। সিলেটের জকিগঞ্জ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক ঘটনা ঘটছে।”

যেখানে যে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে’ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ‘নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা নিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “কুমিল্লার এই দুঃখজনক ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করব।আমরা কয়েক জনকে চিহ্নিত করেছি, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা তাদেরকে শনাক্ত করে… মনে করছি, শিগগিরই গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।”

এ পর্যন্ত কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “কুমিল্লায় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সারাদেশেও কিছু কিছু বিশৃঙ্খলাকারী, যারা উসকানি দিচ্ছিল, তাদের কয়েকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।”

আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, “গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। যেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে সেখানেই গ্রেপ্তার হবে। আমরা চাই সুনির্দিষ্টভাবে যারা জড়িত ছিল, কিংবা উসকানি দিয়েছে, কিংবা এই ধরনের নাশকতা করার প্রচেষ্টা নিয়েছে, তাদেরকেই গ্রেপ্তার করতে।”

অনেককে ভিডিও দেখে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সবকিছু পরে জানিয়ে দেব।… যারাই করে থাকেন, যদি দেশের ভেতরে থেকে করে থাকেন তাহলে তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চিহ্নিত করে আপনাদের সামনে হাজির করবে।

“যারা এটা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেব।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আরও স্পষ্ট করে বলতে পারি, যারা ধর্মকর্ম করে, যারা ধর্ম বিশ্বাস করে, তারা এই ঘটনা ঘটাতে পারে না।একটা অসাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন, যেটা আমাদের দেশে আছে, সেটাকে নষ্ট করার জন্য এই প্রক্রিয়া হতে পারে বলে আমরা মনে করি।”

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর ‘চেষ্টা চলছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারেই এ ধরনের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

“যে সব জায়গায় এই ঘটনা ঘটছে, সেখানে যদি কেউ উসকানি দিয়ে থাকেন কিংবা এর সঙ্গে জড়িত থেকে ষড়যন্ত্র করেন, তাকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।”

মন্ত্রী বলেন, দুর্গাপূজার আগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যেখানে পূজা হবে, সেখানে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে পূজা কমিটি থেকেও স্বেচ্ছাসেবী দেওয়া হবে। কিন্তু অনেক মণ্ডপে তা হয়নি।

“আমি আবারও আহ্বান করছি, পূজামণ্ডপ সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসেন। ভলান্টিয়ার যেন তারা নিয়োগ করেন।”

প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া পর্যন্ত যাতে আর কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “কেউ যাতে কোনো ধরনের উসকানিতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।”

সোশাল মিডিয়ায় যে অপপ্রচার চলছে, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা ফেইসবুকে দেখলাম, আইজিপি সাহেব নাকি একটা নির্দেশনা দিয়েছেন- পূজা বন্ধ। আমরা এই ধরনের কোনো নির্দেশনা দিইনি। যারা এই ধরনের অপচেষ্টা করবেন, বা করে যাচ্ছেন, আমরা তাদেরকেও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসব। কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের এই ধরনেরর অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে দেব না।”

চাঁদপুরে সংঘর্ষের সময় হতাহতের যে ঘটনা ঘটেছে, সেখানে কারও কোনো গাফিলতি থাকলে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথাও বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিজিবি মোতায়েনের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) স্বল্পতা থাকলে সেখানে বিজিবি আসে। স্বল্পতা মানে হল আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী নেই তা নয়… সহযোগিতা করার জন্য... যদি মনে করে এখানে একটা বিশৃঙ্খলা হতে পারে, তখন ওই এলাকার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অনুরোধক্রমে বিজিবি আসে। জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ কিছু কিছু জায়গায় বিজিবি গেছে।”