এইচএসসি: অভিভাবকদের মনে স্বস্তি, সঙ্গে আছে উদ্বেগও

মহামারীর কারণে দেড় বছরের বেশি সময় বিরতি দিয়ে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে স্বস্তি থাকলেও প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড় যাওয়ায় গত বছর উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষা নিতে পারেনি সরকার। নির্ধারিত সময়ের আট মাস পর বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের মাধ্যমে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

এবার সশরীরে ক্লাসের সুযোগ কম পাওয়ায় পরীক্ষা হচ্ছে নতুন নিয়মে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে গ্রুপভিত্তিক তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ে ছয়টি পত্রের পরীক্ষা দিতে হবে তাদের। তিন ঘণ্টার বদলে পরীক্ষায় সময় থাকছে দেড় ঘণ্টা।

নতুন নিয়মে বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থীদের ১৫ মিনিটে ১২টি এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। আর সোয়া ১ ঘণ্টায় তত্ত্বীয় পরীক্ষায় দিতে হয়েছে দুটির উত্তর।

প্রথমদিন রাজধানীর কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কেন্দ্রে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা বলছেন, তেমন প্রস্তুতি ছাড়াই দীর্ঘ বিরতির পর পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, তার প্রভাব পড়তে পারে ফলাফলে।

মিরপুর কলেজের এক শিক্ষার্থীর মা রওশন আক্তার মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। দেড় বছর সরাসরি ক্লাসের বাইরে থেকে ছেলে পরীক্ষায় বসায় উদ্বিগ্ন এই অভিভাবক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “করোনার কারণে তো তেমন ক্লাস-পরীক্ষা হয় নাই। অনেক টেনশন লাগতেছে। এমন প্রশ্নে তো আগে কোন পরীক্ষাও দেয় নাই, দিলে হয়ত কনফিডেন্স থাকত। দেখা যাক, কী হয়।”

পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ঘাটতির কথা জানিয়ে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের শিক্ষার্থী রিহাবুল তানভীর ফাহিম বলেন, “শর্ট সিলেবাস আমরা শেষ করেছি। কিন্তু অনেকদিন পরে পরীক্ষা হচ্ছে।

“অনেকে তো ভেবেছিল পরীক্ষা হবে না। সে কারণে প্রস্তুতিও তেমন নেয়নি। আবার কলেজে তেমন পরীক্ষাও হয়নি যে আমাদের প্র্যাকটিসটা থাকবে। সে কারণে কিছুটা ভয় লাগছে।”

শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ কেন্দ্রে ছেলে পরীক্ষা দেওয়ায় বাইরে অপেক্ষা করছিলেন গুলশান এ খাতুন, অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে পরীক্ষার সময় বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলছিলেন তিনি।

জানতে চাইলে রোটারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই শিক্ষক বলেন, “আমাদের বাচ্চাদের প্রস্তুতি ভালো। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার সময় আমি দেখেছি, বাচ্চাদের হাত অনেক স্লো হয়ে গেছে।

“দীর্ঘদিন তাদের পরীক্ষা হয়নি, তাদের হাতের স্পিডও কমে গেছে। অনেক পরীক্ষার্থীকে দেখেছি লিখে শেষ করতে পারেনি। লিখতে হয় কম, কিন্তু ২৫টা এমসিকিউ থেকে ১২টা দিতে হয় ১৫ মিনিটে।

“এই প্রশ্নগুলো পড়তে অনেক সময় লেগে যায়। আর রচনামূলক আটটি প্রশ্ন থেকে দুটি দিতে হবে। তো এতো বড় প্রশ্ন পড়তে তো সময় লাগছে। তাই আমার মনে হয় সময়টা দুই ঘণ্টা করলে ভালো হত।”

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী আশরাফ আহমেদের বাবা এস এম দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, মহামারীর কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কমবে না।

“সরকার বুঝেশুনেই পরীক্ষা নিচ্ছে। তবে অনলাইনে যে ক্লাস হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের অনেক গ্যাপ থেকে গেছে। পরীক্ষা নেওয়ায় আমরা খুশি, কিন্তু বাচ্চাদের ক্ষতি হয়ে গেছে অপূরণীয়।”

গতবারের মত ‘অটোপাস’ না দিয়ে এবার পরীক্ষা নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের কিছুটা হলেও মেধার যাচাই হবে বলে মনে করেন মিরপুর ক্যান্টমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক আফিয়া দিল সিদ্দীকা।

তিনি বলেন, “বাচ্চারা কী পড়াশুনা করল, সেটার একটা মূল্যায়ন খুব জরুরি। যদি অটোপাসই দিয়ে দিত, তাহলে এইচএসসিতে কী শিখল- তা জানা যেত না। তাহলে এই ক্লাসে পড়ে কী লাভ হল।

“যদিও করোনার কারণে বাচ্চারা তেমন পড়াশুনা করে নাই। আমরাও তাদের জোর করিনি। যতটুকু বুঝিয়ে করানো গেছে করিয়েছি।”

কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম। তার দুই ছেলে-মেয়ে মিরপুরের এস ও এস হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।

এই অভিভাবক বলেন, “ক্লাস-পরীক্ষা এগুলো বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের মধ্যে পড়ার আগ্রহ কমে গেছে। পরীক্ষা হলে কমপিটেটিভ মেন্টালিটি থাকে। তখন পড়াশোনাটাও ভালো হয়। কিন্তু করোনা সিচুয়েশনে সেটা সম্ভব হয়নি।

“তারপরও পরীক্ষা নেওয়াটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। পরীক্ষার ঘোষণা আসার পর থেকে বাচ্চারা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে। অটোপাস দিলে তো এটুকুও হত না।”

গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগেই এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়। এরপর ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও মহামারীর কারণে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এইচএসসি পরীক্ষা হয়নি।

পরে এ বছর জানুয়ারিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলের গড় করে শিক্ষার্থীদের এইচএসসির মূল্যায়ন ফল প্রকাশ করা হয়।

এবার দুই হাজার ৬২১টি কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার নয়টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় বসার কথা।

মহামারী পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলেছিল। একজনের বেশি অভিভাবককে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কেন্দ্রে না আসতেও বলা হয়েছিল।

রাজধানীর কয়েকটি কেন্দ্রে দেখা গেছে নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের হাত জীবাণুমুক্ত করে প্রবেশ করানো হচ্ছে। তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থাও ছিল কয়েকটি কেন্দ্রে।

মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল আফরিনা পারভীন বললেন, তারা শিক্ষার্থীদের হাত জীবাণুমুক্ত করে তাপমাত্র মেপে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করিয়েছেন।

“আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের আইসোলেশন রুমও প্রস্তুত আছে, কারও জ্বর থাকলে বা করোনাভাইরাসের লক্ষণ থাকলে তাদের সেখানে পরীক্ষা নেওয়া হবে।”

পরীক্ষা চলার সময় শিক্ষার্থী ও কেন্দ্রের কর্মী ছাড়া অন্য কাউকে কেন্দ্রের ২০০ গজের ভেতর প্রবেশ না করতে বলা হয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে। তারপরও বিভিন্ন কলেজের বাইরে অভিভাবদের জটলা দেখা দেছে। অভিভাবকদের সরে যেতে মাইকে ঘোষণা দিলেও তা মানেননি অনেকে।

মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবদের ভিড়ে প্রধান সড়কে যান চলাচলে ধীর গতি দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসময় বার বার অভিভাবকদের সরিয়ে দেয়।

এ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল আবদুস সামাদ বলেন, “নির্দেশনা দেয়ই। কিন্তু এইগুলা মানা যায় না। বাচ্চারা পরীক্ষা দিতে আসে, সঙ্গে তো বাবা-মা আসবেই।”

অভিভাবদের ভিড়ের বিষয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল আফরিনা পারভীন বলেন, “আমাদের কর্মীরা, পুলিশের সদস্যরা তাদের সরিয়ে দিয়েছে, তারা আবার কেন্দ্রের সামনে ভিড় করেছে। আমরা তো তাদের সাথে খারাপ আচরণ করতে পারি না।”

এই কেন্দ্রে মা ও ছোট বোনকে নিয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের পরীক্ষার্থী রুবিনা আক্তার। ভিড়ের কারণে কেন্দ্রে প্রবেশে যে সমস্যা হয়েছে, তা জানালেন এই পরীক্ষার্থীও।

রুবিনা বলেন, “একটু তো সমস্যা হচ্ছেই। কিন্তু সব বাবা-মাই তো চায় বাচ্চার সাথে আসতে। সবার সাথেই দুই-তিনজন করে এসেছে। আর পাবলিক পরীক্ষায় ভিড় হয়ই।”

মিরপুর ১৪ নম্বরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে এবার পরীক্ষা দিচ্ছে ১২টি বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা। এই কেন্দ্রে অনেক শিক্ষার্থীর আসন পড়ায় অভিভাবকদের বাড়তি চাপ দেখা গেছে।

সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে অধিকাংশ পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে ঢুকে গেলেও অভিভাবকরা দাঁড়িয়ে থাকেন। এ কেন্দ্রটি প্রধান সড়কের সঙ্গে থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। এসময় বার বার মাইকে ঘোষণা দিয়ে অভিভাবকদের সরে যেতে বলা হয়।