‘মাসুদ রানা’র কী হবে

মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন চলে গেছেন অনন্ত জীবনে; তার রেখে যাওয়া এই জনপ্রিয় স্পাই থ্রিলারের ভাগ্যে এখন কী ঘটবে?

কপিরাইট অফিস বলছে, লেখকের উত্তরাধিকাররা চাইলে চরিত্রটি জিইয়ে রাখতে পারেন।

বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জিজ্ঞাসায় কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, “কাজী আনোয়ার হোসেনের উত্তরাধিকারীরা মাসুদ রানা চরিত্র নিয়ে সিরিজ লিখতে পারবেন; আবার তাদের অনুমতি নিয়ে যে কেউ লিখতে পারবেন।”

জেমস বন্ডের স্বাদ মাসুদ রানার মাধ্যমে দিয়ে বাংলাদেশের পাঠকের কৈশোরের নায়কের আসনে ঠাঁই করে নেওয়া কাজী আনোয়ার হোসেন বুধবার মারা গেছেন।

নিজের প্রতিষ্ঠিত সেবা প্রকাশনী থেকে ১৯৬৬ সালে ‘ধ্বংস পাহাড়’ দিয়ে মাসুদ রানা সিরিজ লেখা শুরু করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। চরিত্রটি বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চরিত্রটি জিইয়ে রেখেছিলেন তিনি। সাড়ে পাঁচ দশকজুড়ে পাঠকদের কল্পনার রাজ্যে রাজত্ব করেছে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই মাসুদ রানা।

সিরিজের গোড়ার দিকের ১১টি বই লিখে মাসুদ রানার ভিত্তি রচনা করেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। পরে ‘ঘোস্ট রাইটার’ হিসেবে সেবা প্রকাশনীর কর্মকর্তা শেখ আব্দুল হাকিমকে দিয়ে সিরিজের ২৬০টি বই লিখিয়েছিলেন তিনি।

কাজী আনোয়ার হোসেন।

কপিরাইট অফিস বলছে, সিরিজের চার শতাধিক বইয়ের মধ্যে শেখ আব্দুল হাকিমের কাছে অধিকাংশ বইয়ের মালিকানা হারালেও মাসুদ রানা চরিত্রের একমাত্র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন। ফলে কাজী আনোয়ার হোসেনের উত্তরাধিকারের অনুমতি ছাড়া এখন কেউ সিরিজটি লিখতে পারবেন না।

তবে জীবদ্দশায় মাসুদ রানার কোনো কপিরাইট করেননি কাজী আনোয়ার হোসেন; শুধু চরিত্র নয়, সিরিজের কোনো বইয়ের কপিরাইটও করাননি এ লেখক।

মাসুদ রানা চরিত্রের সত্ত্বাধিকারী হিসেবে কপিরাইট করা না থাকলেও আনোয়ার হোসেনকেই চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছে কপিরাইট অফিস।

জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, সিরিজের প্রথম ১১টি বই কাজী আনোয়ার হোসেন লিখেছেন; এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক কিংবা কারও কোনো দাবি-আপত্তি নেই। ফলে মাসুদ রানা চরিত্রটি উনিই সৃষ্টি করেছেন-এ বিষয়ে কারও সংশয় নেই।

তবে আইনি জটিলতা এড়াতে মাসুদ রানার সত্ত্বাধিকারী হিসেবে আনোয়ার হোসেনের পরিবারকে সত্ত্ব পেতে আবেদনের আহ্বান জানিয়েছে কপিরাইট অফিস।

কাজী আনোয়ার হোসেনের অনুমতি নিয়েই শেখ আবদুল হাকিম কিংবা ইফতেখার আমিনসহ অন্যরা মাসুদ রানা সিরিজ লিখেছেন, কপিরাইট আইন অনুযায়ী যার অর্থ হল-বইগুলো শেখ আবদুল হাকিম কিংবা ইফতেখার আমিনদের হলেও চরিত্রটি কাজী আনোয়ার হোসেনেরই থাকছে।  

আইন অনুসারে, মাসুদ রানার উত্তরাধিকারী হবেন কাজী আনোয়ার হোসেনের সন্তান কাজী শাহনূর হোসেন, কাজী মায়মুর হোসেন ও শাহরীন সোনিয়া।

কয়েক বছর আগে থেকেই বাবার সঙ্গে মাসুদ রানা সিরিজ লেখায় যুক্ত হয়েছেন কাজী মায়মুর হোসেন; ২০২১ সালে প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের ‘স্বর্ণলিপ্সা’, ‘কাউন্ট কোবরা’সহ কয়েকটি বইয়ে মূল লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে সহযোগী লেখক হিসেবে মায়মুরের নাম দেখা গেছে।

‘মাসুদ রানা’র মালিকানা কাজী আনোয়ার হোসেনের  

কাজী আনোয়ার হোসেনই খুঁজে নিলেন পর্দার মাসুদ রানাকে  

‘মাসুদ রানা’কে রেখে চলে গেলেন ‘কাজীদা’  

বাবার অবর্তমানে মায়মুরই মাসুদ রানার হাল ধরছেন-এমন আলোচনাও চলছে সাহিত্য অঙ্গনে, তবে বিষয়টি নিয়ে উত্তরাধিকারদের কোনো বক্তব্য জানতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

শুধু লেখায় নয়, মাসুদ রানাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণেও পরিবারের অনুমতি নিতে হবে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের অনুমতি নিয়ে ১৯৭৪ সালে মাসুদ রানার প্রথম চলচ্চিত্রায়ন ঘটে সিরিজের ‘বিস্মরণ’ বইটি নিয়ে। কল্পনার মাসুদ রানার ভূমিকায় এসেছিলেন সোহেল রানা, সেটাই এই চিত্রনায়কের প্রথম সিনেমা।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্যাকেজ নাটকের শুরুও মাসুদ রানাকে নিয়ে। সিরিজের পিশাচ দ্বীপ নিয়ে আতিকুল হক চৌধুরী তৈরি করেন নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’, যাতে মাসুদ রানার ভূমিকায় ছিলেন নোবেল, তার সঙ্গী সোহানা হয়েছিলেন বিপাশা হায়াৎ।

মাসুদ রানাকে নিয়ে দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রেখেছে জাজ মাল্টিমিডিয়া।

সিরিজের ‘ধ্বংস পাহাড়’ উপন্যাস অবলম্বনে জাজের প্রযোজনায় ‘এমআর-নাইন’ শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন হলিউডের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পরিচালক আসিফ আকবর।

এ সিনেমায় মাসুদ রানার চরিত্রে তরুণ অভিনেতা এবিএম সুমনকে নির্বাচন করে গেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেই; ভারতীয় গুপ্তচর সুলতা রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করছেন বিদ্যা সিনহা মিম।

জাজের প্রযোজনায় ‘মাসুদ রানা’ নামে আরেকটি সিনেমা নির্মাণের অপেক্ষায় আছে ।