আলতাব আলী পা‌র্কের শহীদ মিনারে একুশের গানের রচয়িতাকে শেষ বিদায়

যার লেখা গান কণ্ঠে নিয়ে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি প্রভাতফেরিতে যায়, সেই আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হল লন্ডনের আলতাব আলী পা‌র্কের শহীদ মিনারে।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত প্রবাসী আর বাংলাদেশ হাই কমিশনের কর্মকর্তারা তাকে শেষ বিদায় জানালেন ভালোবাসার ফুলে।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী এই লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্টের মরদেহ শুক্রবার দুপুরে নিয়ে যাওয়া হয় পূর্ব লন্ড‌নের ব্রিক‌ লেইন মস‌জি‌দে। সেখানে জুমার পর জানাজায় অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।  গাফফার চৌধুরীর একমাত্র ছেলে অনুপম চৌধুরী বাবার জন্য দোয়া চান সবার কাছে।

জানাজা শেষে একাত্তরের মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলার নির্বাহী সম্পাদক গাফফার চৌধুরীর কফিন নেওয়া হয় আলতাব আলী পা‌র্কের শহীদ মিনার চত্বরে।

সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম। এরপর বি‌ভিন্ন রাজনৈতিক-সামা‌জিক-সাংস্কৃ‌তিক সংগঠ‌ন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল দেন কফিনে।

আগামী বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে গাফফার চৌধুরীর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক।

হাই কমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম জানান, গাফফার চৌধুরীর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তাকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্ত্রীর পাশে সমাহিত করা হবে।

বৃহস্পতিবার সকালে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় গাফফার চৌধুরীর। ৮৮ বছরের জীবনে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকারের আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের সাক্ষী ছিলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর প্রবাস জীবন বেছে নিলেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি বাংলাদেশ থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আর সমকালীন বিষয় নিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখে গেছেন দুই হাতে।

গল্প-কবিতা-উপন্যাস লিখেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, বাংলাদেশে কলাম লেখাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পথ তৈরি করেছেন গাফফার চৌধুরী।

শ্রদ্ধা জানানোর পর সংবাদমাধ্যমে কথা বলছেন হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম, পাশে প্রয়াতের ছেলে অনুপম চৌধুরী

কিন্তু অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে তরুণ বেলার একটি কাজের জন্যই বাঙালি আর বাংলাদেশের সঙ্গে অনন্তকাল জড়িয়ে থাকবেন তিনি। তা হল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র গানটি রচনা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাঙালির মিছিলে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর গুলি চালানোর পর ঢাকা মেডিকেলে আহত ছাত্রদের দেখতে গিয়েছিলেন গাফফার চৌধুরী। তখন তিনি ঢাকা কলেজে পড়েন।

মেডিকেলের বহির্বিভাগে ভাষা সংগ্রামী রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখে তার বারবার মনে হতে থাকে, এটা যেন তার নিজের ভাইয়েরই রক্তমাখা লাশ। তখনই তার মাথায় আসে একটি লাইন, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।”

একুশের গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরীর চিরবিদায়

গাফফার চৌধুরী: বাঁক বদলের সাক্ষী, এক গানেই কিংবদন্তি  

এরপর ইতিহাস হয়ে যায় সেই কবিতা। প্রথমে আবদুল লতিফের সুরে তা গানে রূপ নেয়। পরে আলতাফ মাহমুদের সুরে তা হয়ে ওঠে অবিনাশী ভাষার গান।

এখন প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেই গান কণ্ঠে নিয়ে প্রভাতফেরিতে যায় বাংলাদেশের মানুষ। বিবিসি শ্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এটি তৃতীয় স্থানে উঠে আসে।

ওই গান লেখার সময় সবে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন গাফফার চৌধুরী। জন্ম তার ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার উলানিয়ার জমিদার পরিবারে।

তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় স্থানীয় মাদ্রাসায়। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রাথমিকে পড়ার পর হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫৩ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেন।

ঢাকায় এসেই রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে নিজেও আহত হয়েছিলেন। তবে পরিবার থেকেই আসে তার রাজনীতির চেতনা। তার বাবা ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলা কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির সভাপতি ছিলেন।

গাফফার চৌধুরী যখন প্রাথমিকের ছাত্র, তখন তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ষষ্ট শ্রেণিতে থাকাকালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক নবযুগের ছোটদের পাতায় তার লেখা প্রথম ছাপা হয়। তারপর স্কুলছাত্র থাকাবস্থায়ই তার লেখা কলকাতার সওগাত, ঢাকার সোনার বাংলা (অধুনালুপ্ত) পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়।

একুশের সেই অবিনাশী গান যেভাবে এল

‘বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, গানটি ততদিন থাকবে’  

এসএসসি পাসের পর তিনি যখন ঢাকায় আসেন, তখন সওগাত, মোহাম্মদী, মাহে লও, দিলরুবা প্রভৃতি মাসিক পত্রিকায় তার গল্প-উপন্যাস ছাপা হতে থাকে।

তরুণ বয়সে বহু কবিতা লেখা গাফফার চৌধুরীর প্রথম বইটি ছিল শিশুদের জন্য। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত সেই বইয়ের নাম ছিল ‘ডানপিটে শওকত’। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কৃষ্ণপক্ষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে। তার প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’।

নাম না জানা ভোর, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ, সম্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দর, বাংলাদেশ কথা কয় তার লেখা বইগুলোর অন্যতম। তার লেখা নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’, ‘একজন তাহমিনা’ ও ‘রক্তাক্ত আগস্ট’।

নিজের লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ অবলম্বনে ২০০৭ সালে একটি টেলিভিশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন গাফফার চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনাকে নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘দুর্গম পথের যাত্রী’।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ভীমরুল, তৃতীয় মত, কাছে দূরে, একুশ শতকের বটতলায়, কালের আয়নায়, দৃষ্টিকোণ শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখেছেন তিনি। কাজ করেছেন বহু পত্রিকায়।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ হয় তার। দেশে ফেরার পর গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতায় যান গাফফার চৌধুরী। পরে ১৯৭৪ সালে স্ত্রীকে নিয়ে পাড়ি জমান লন্ডনে। তখনই তাদের প্রবাস জীবনের শুরু।

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ইতিহাস ছিল যার ‘ঠোঁটস্থ’, বিশ্লেষণে ছিল ‘স্বকীয়তা’

গাফফার চৌধুরীর যে ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল  

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী অবলম্বনে ‘দ্য পোয়েট অব পলেটিক্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন গাফফার চৌধুরী। কিন্তু পরে তা আর এগোয়নি।

সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মানিক মিয়া পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন গাফফার চৌধুরী। বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

১৯৫৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সেলিমা আফরোজের সঙ্গে আবদুল গাফফার চৌধুরীর বিয়ে হয়। ছেলে অনুপম আহমেদ রেজা চৌধুরী এবং চার মেয়ে তনিমা, চিন্ময়ী, বিনীতা ও ইন্দিরাকে রেখে গেছেন তারা।

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!

আরও পড়ুন