বীর মুক্তিযোদ্ধা শাফায়াত জামিল আর নেই

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানে খালেদ মোশাররফের সঙ্গী শাফায়াত জামিলকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে।
ঢাকা, অগাস্ট ১১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শাফায়াত জামিল আর নেই। শনিবার ভোররাতে ঢাকার উত্তরায় নিজ বাড়িতে মৃত্যু হয়েছে তার।

শাফায়াত জামিলের ভাগ্নে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আতিকুল হাফিজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হার্ট অ্যাটাকে রাত আড়াইটার দিকে উনার মৃত্যু হয়েছে।”

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীর বিক্রম খেতাব পাওয়া শাফায়াত জামিলের বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন ছেলে রেখে গেছেন।

শনিবার জোহরের নামাজের পর ঢাকা সেনানিবাস কেন্দ্রীয় মসজিদে শাফায়াত জামিলের জানাজা হয়।

এতে সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি এম তাজুল ইসলাম এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনও ছিলেন।

জানাজার পর সেনাবাহিনীর এই কর্মকর্তাকে সামরিক কায়দায় সম্মান জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় সম্মানও পান এই মুক্তিযোদ্ধা।

শাফায়াত জামিলকে সমাহিত করা হয়েছে বনানীর সেনাবাহিনী কবরস্থানে। সেখানে দাফনের পর সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক সম্পাদক নানক ও আহমদ হোসেন শ্রদ্ধা জানান। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।

এরপর প্রথা অনুযায়ী জাতীয় পতাকা ও সেনাবাহিনীর পতাকা প্রয়াতের ছেলে শাহরিয়ার শাফায়াতের হাতে তুলে দেন সেনাপ্রধান।

জানাজা ও দাফনের সময় দেশের প্রথম সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন, বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক খানও ছিলেন। শাফায়াত জামিলের সহকর্মীরাও ছিলেন সেখানে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর টালমাটাল পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানে খালেদ মোশাররফের সঙ্গী ছিলেন শাফায়েত জামিল।

তখন খালেদ মোশারররফ নিহত হন এবং আটক হন শাফায়াত জামিল। ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ শাফায়াত জামিল সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। অবসরের পর নিভৃত জীবন-যাপন করছিলেন তিনি।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বড় ছেলে শাফকাত শাফায়াত ও মেজ ছেলে শাহরিয়ার শাফায়াত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। ছোট ছেলে সাব্বির আশরার শাফায়াত সেনাবাহিনীর মেজর।


প্রয়াত এই মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সফিউল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট যখন শুরু হয়, শাফায়াত জামিল তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বে ছিলেন। ২৭ মার্চ ওই ব্যাটালিয়নের পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের আটকের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমনের কথা বলে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা এই রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানিকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া পাঠায়। এর একটি কোম্পানির দায়িত্বে ছিলেন শাফায়াত জামিল। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের খবর পেয়ে শাফায়াত জামিল অনুগত সৈন্যদের নিয়ে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

দুই নম্বর সেক্টরের অধীন আশুগঞ্জ-ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও আখাউড়া-গঙ্গাসাগর এলাকায় যুদ্ধ করেন শাফায়াত জামিল। পরে জিয়াউর রহমান নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন তিনি।

শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধের মধ্যে সিলেটের ছাতক যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের ১১ অক্টোবর পরিচালিত এই যুদ্ধে তার নেতৃত্বাধীন তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ৩৬৪ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে।

এরপর রাধানগর অপারেশনের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান দখল করে নেন, যা এর আগে যা ভারতের বিখ্যাত গুর্খা রেজিমেন্টও দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

শাফায়াত জামিলের সহযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস আই এম নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৯৭১ সালে ১৫ মে থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্যারের সঙ্গে অনেক অভিযানে ছিলাম।”

সফিউল্লাহ জানান, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সিলেটের তামাবিলে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে এক যুদ্ধে আহত হন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি তিনি পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর শাফায়াত জামিল রংপুরে ৭২ ব্রিগেডের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টও ৪৬ ব্রিগেডের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শাফায়াত জামিলের ব্রিগেড সক্রিয় হলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত বলে বিশ্লেষকদের মতের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তৎকালীন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ প্রয়াত সহকর্মী সম্পর্কে এ বিষয়ে কিছু বলতে চাননি।

তবে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, “তিনি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।”

শাফায়াত জামিলের জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার খড়গমারা গ্রামে। তার বাবা এ এইচ এম করিমুল¬াহ পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন।

ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ১৯৬৪ সালে কমিশন পান শাফায়াত জামিল। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ তার কোর্সমেট ছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএমআর/এসইউএম/কেটি/এমআই/১৬৪৩ ঘ.