বইমেলার বাইরে হামলায় লেখক অভিজিৎ নিহত

এক দশক আগে যেভাবে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছিল, বইমেলার বাইরে সেই কায়দায় হামলায় হত্যা করা হয়েছে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক অভিজিৎ রায়কে।

মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিতের সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় হামলায় আহত হয়েছেন তার স্ত্রী ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যাও।

লেখালেখি নিয়ে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিবাদীরা। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত লিখতেন

এবার একুশের বইমেলায় দুটি বই প্রকাশ হয়েছে অভিজিতের, সে কারণেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরেছিলেন শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অজয় রায়ের এই ছেলে।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উল্টো দিকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন সড়কে হামলার পরপরই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় দুজনকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অভিজিৎ ও বন্যা বইমেলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। দুর্বৃত্তরা ফুটপাতে তাদের কোপায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ধারাল অস্ত্রের জখম নিয়ে অভিজিৎ ও বন্যাকে হাসপাতালে আনা হয়।

মাথায় গুরুতর জখম নিয়ে সঙ্কটাপন্ন অভিজিৎকে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে পুলিশ পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন।

ছেলের ওপর হামলার খবর শুনে হাসপাতালে অজয় রায়

হামলাস্থল ঘিরে রেখেছে পুলিশ

হাসপাতালে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ আলীও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে অভিজিৎ মারা গেছেন।”

এরপর যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মেডিকেলের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের আবাসিক সার্জন রিয়াজ মোর্শেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অভিজিতের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন।

হামলার স্থলে জমাট বাঁধা রক্ত

আহত রাফিদা আহমেদ বন্যা

বন্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার একটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

শাহবাগ থানার এসআই সোহেল রানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জানার চেষ্টা করছে, বিষয়টি কেন ঘটেছে।”

অভিজিৎ রায় (ফেইসবুক থেকে নেওয়া ছবি)

অভিজিৎ রায় ও রাফিদা আহমেদ বন্যা (ফেইসবুক থেকে নেওয়া ছবি)

অভিজিৎ ও বন্যার ওপর কারা হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি কোনো সূত্রে। তবে ঘটনাস্থলে দুটি চাপাতি পাওয়া গেছে।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে একইভাবে চাপাতি দিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছিল। ওই হামলায় জঙ্গিরা জড়িত ছিল বলে পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। 

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকেও রাজধানীর মিরপুরে তার বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ওই হত্যাকাণ্ডেও জঙ্গিবাদীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

অভিজিতের ওপর হামলার খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপস্থিত অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “যারা অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল, তারাই একইভাবে আবার হামলা চালিয়েছে।”

ফেইসবুকে অভিজিৎ রায়ের শেষ পোস্ট

ড. অভিজিৎ রায়ের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অবিশ্বাসের দর্শন, ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’, ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’, ‘ভালবাসা কারে কয়’, স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, সমকামিতা : বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান।

অভিজিৎ রায়ের বই বাংলা বই বিক্রির ওয়েবসাইট ‘রকমারি ডটকম’ থেকে সরাতে হুমকি দিয়েছিলেন হত্যাকাণ্ডে উসকানিদানের অভিযোগে গ্রেপ্তার ফারাবী শফিউর রহমান।

শাহবাগ আন্দোলনের মধ্যে ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডের পর ফেইসবুকে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দেওয়ার পর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ফারাবীকে। পরে জামিনে ছাড়া পান তিনি।