পরীর পাহাড়: আইনজীবীদের সেই ৫ ভবনের ‘নেই’ পরিবেশ ছাড়পত্র

চট্টগ্রামের আদালত ভবন যেখানে, সেই পরীর পাহাড়ে নতুন ভবন নির্মাণ নিয়ে চলমান বিরোধের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন বলছে, সেখানে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির আগের পাঁচটি ভবন ছাড়পত্র ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে।

পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সমিতির নেতারাও।

পরীর পাহাড়, আদালত ভবন ও সংলগ্ন এলাকার টিলা শ্রেণির ভূমির বিষয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে মতামত চাওয়া হলে অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে আসে।

পরিদর্শন শেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সম্প্রতি প্রতিবেদন পাঠানোর কথা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী।

প্রতিবেদনে আইনজীবীদের আগের ভবনগুলোর ছাড়পত্র না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে আদালত পাড়া হিসেবে পরিচিত পরীর পাহাড়ে আইনজীবীদের পাঁচটি ভবনের পেছনের অংশ।ছবি: সুমন বাবু

একই সঙ্গে পরীর পাহাড়ে অবৈধ দখলে থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শতাধিক স্থাপনা অপসারনের সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

পরীর পাহাড়ে ওঠার ঢালে আইনজীবীদের বর্তমান পাঁচটি ভবনের পাশে আরও দুটি নতুন ভবন করা নিয়ে আইনজীবী সমিতি ও জেলা প্রশাসনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে সামনে আসে।

এর মধ্যেই পরীর পাহাড়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণ না করতে এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে তাতে সায় দেন প্রধানমন্ত্রী।

এরপর পরীর পাহাড়কে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হিসেবে সংরক্ষণে জেলা প্রশাসনের প্রস্তাব বিবেচনা করার কথাও জানিয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৮ সেপ্টেম্বর চটগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এ পাহাড় পরিদর্শন করে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল।

পরিদর্শনের পর দলটি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচ এম জিয়া উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে প্রতিবেদন তৈরি করেন।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ছয়টি মতামত দিয়েছে পরিদর্শক দল।

পরীর পাহাড়: চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যাচারের’ অভিযোগ আইনজীবীদের

পরীর পাহাড়কে ‘হেরিটেজ’ করার প্রস্তাব, সরকারি অফিস যাবে কালুরঘাট  

এতে বলা হয়- “টিলা শ্রেণির ভূমিতে নির্মাণ কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুসারে ছাড়পত্র গ্রহণ অপরিহার্য হলেও তা এক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়নি।”

চট্টগ্রামে আদালত পাড়া হিসেবে পরিচিত পরীর পাহাড়ে আইনজীবীদের বর্তমান ভবনের পাশে সবুজ অংশে নতুন দুই ভবন করার পরিকল্পনা করছে আইনজীবী সমিতি। ছবি: সুমন বাবু

জানতে চাইলে নূরুল্লাহ নূরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ছয়টি মতামত দিয়েছি।

“মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। সেটিও আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর জানাবে। এরআগে প্রতিবেদনের বিষয়ে ডিসক্লোজ করতে পারব না।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায় এতে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিনের বরাতে বলা হয়েছে, “পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়টি (তার ও আগের সমিতির নেতাদের) জানা ছিল না বিধায় ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি।”

জানতে চাইলে জিয়া উদ্দিন বলেন, “যখন ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়- তখন ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয় ছিল না। তাই নেওয়া হয়নি।”

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুধু পরিবেশ ছাড়পত্র নয়, তাদের অনেক কিছুই নেই।

“ভূমি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এরপর সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সেভাবেই হবে।”

১৯৭৭ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ইজারা দলিল মূলে পরীর পাহাড়ে আইনজীবী সমিতিকে ১২ দশমিক ৯০ শতক জমি ইজারা দেওয়া হয়।

শুরুতে সেখানে ‘আইনজীবী সমিতি ভবন’ নির্মাণ করা হয়। পরে আরও চারটি ভবন নির্মাণ করে আইনজীবীদের চেম্বার বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এসব ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে ইজারা নেওয়া ‘টিলা শ্রেণির’ জমির অতিরিক্ত ১ দশমিক ২৪ একর বেশি জমি সমিতি দখল করার বিষয়টিও সম্প্রতি সামনে এসেছে বলে দাবি জেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধতন কর্মকর্তার। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

পরীর পাহাড়ে নতুন স্থাপনায় ‘প্রধানমন্ত্রীর মানা’

পরীর পাহাড়ে নতুন ভবন: সিদ্ধান্তে অনড় চট্টগ্রামের আইনজীবীরা

চট্টগ্রামে পরীর পাহাড়ে ভবন নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রশাসন ও আইনজীবী সমিতি  

পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে পরীর পাহাড়ে টিলা ভূমির ঢালুতে মসজিদ এবং টিলা শ্রেণির জমিতে সেমিপাকা হোটেল রেস্টুরেন্ট, কেন্টিন, চা দোকান, ফটোকপি দোকান, কম্পিউটার কম্পোজের দোকান, ফলের দোকান, টিনশেড বসত বাড়ি ও সেমিপাকা স্থাপনাসহ শতাধিক স্থাপনা ‘অবৈধ দখলকারীরা’ দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবহার করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম আদালত ভবনে ওঠার পথে আইনজীবীদের ভবন

প্রতিবেদনে এসব স্থাপনা অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, “পরীর পাহাড়ে সরকারি ভবনগুলো ছাড়া আনুমানিক শতাধিক পাকা-আধাপাকা, টিনশেড ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা আছে। এসব স্থাপনাসমূহ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অপসারণ করা যেতে পারে।”

জেলা আইনজীবী সমিতির পাঁচ ভবনের অনুমোদন সিডিএ থেকে যথাযথ প্রক্রিয়া ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে কি না সেটিও পৃথক কমিটি করে যাচাই করা যেতে পারে বলে মত দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর।

এতে বলা হয়- “পরীর পাহাড়ে বেসরকারি ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসারে এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেশিও), এমজিসি (ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ), গাড়ি পার্কিং এরিয়া, রাস্তার প্রশস্ততা, সর্বনিম্ন উন্মুক্ত স্থান, সবুজায়ন এলাকা সংরক্ষণ করা হয়নি।”

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীর পাহাড়ে পাহাড় শ্রেণির জমিতে ইতোমধ্যে স্থাপিত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল স্থাপনাসমূহ অপসারণ বিষয়ে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মত দেয় অধিদপ্তর।

আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের কাছে অতিরিক্ত জমি দখলে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে তাদের (জেলা প্রশাসন) আদালতে যেতে বলেন। আমরা আদালতে জবাব দিব।”

সমিতির দাবি, এ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের পর ২০১৪ সালে সেসময়ের জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে এ জমির সীমানা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়।