মা-বোনের সঙ্গে ‘নাস্তা করা হল না’ ফারুকের

চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার বালুছড়া কাশেম কলোনিতে রোববার সকালে গ্যাস বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে নিহত ওমর ফারুকের মৃত্যুর সংবাদে নির্বাক মা। ছবি: উত্তম সেন গুপ্ত
দর্জির দোকানের কর্মী ওমর ফারুক কয়েক মাস পরপর কর্মস্থল থেকে চট্টগ্রামে নিজের বাসায় আসতেন। এবার তিন মাস পর এসেছিলেন। হোটেল থেকে নাস্তা কিনে ফিরছিলেন। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে নাস্তা আর করা হলো না তার।

রোববার চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার বালুছড়া কাশেম কলোনীতে দেয়াল ধসে মারা যান ২৪ বছর বয়সী এ যুবক। বিস্ফোরণে দেয়াল ধসের ওই ঘটনার জন্য ‘দাহ্য পদার্থ বা জমাট গ্যাস’ দায়ী বলে পুলিশের ধারণা।

যে ভবনটির নিচ তলায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে তার দুই পাশে ঘর, সরু গলি দিয়ে প্রবেশ করতে হয় পেছনের কাশেম কলোনীতে। সেখানে বেড়ার ঘরে ভাড়া থাকেন আরও বেশ কিছু পরিবার। সেসব ঘরের একটিতে ভাড়া থাকেন ফারুকের বাবা, মা ও ছোট ভাই- বোন। বালুছড়া সেনানিবাস গেইট এলাকায় পান-সিগারেট বিক্রি করেন ফারুকের বাবা বদিউল আলম।

ওমর ফারুকের স্বজনরা জানান, সকালে মা, বোনের সাথে নাস্তা করতে চেয়েছিলেন। নাস্তা কিনে বাসায় ফেরার পথে দেয়াল ধসে তিনি আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর ফারুকের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার মা হালিমা বেগম। সামনে বসে আছে এক মাত্র ছোট বোন আরজু আক্তার।

আরজু আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, নগরীর চকবাজার এলাকায় তার মামার বাসায় থাকেন। সেখানে একটি দর্জির দোকানে কাজ করেন। কয়েক মাস পরপর বালুছড়ায় বাসায় আসেন। কয়েকদিন থেকে আবার চলে যান। এবার এসেছিলেন গত বৃহস্পতিবার।

“সবাই মিলে নাস্তা করার জন্য ফারুক গিয়েছিলেন নাস্তা কিনতে। ফেরার পথে দেয়াল ধসে সে মারা যায়।”

মেয়ে কথা বলার সময় হালিমা বলে উঠেন, তার ছেলে গত কোরবানির ঈদে এসেছিলেন। ওই সময় ১২ দিন তাদের সাথে ছিলেন। এবার এসেছেন তিন দিন আগে। এ আসায় তার শেষ আসা…

চট্টগ্রামের বাসায় বিস্ফোরণ, দেয়াল ভেঙে একজনের মৃত্যু  

রোববার সকালে বালুছড়া কাশেম কলোনিতে বিস্ফোরণের ওই ঘটনা ঘটে বলে ফায়ার সার্ভিস বায়েজিদ বোস্তামী স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার কবির হোসেন জানান।

কবির হোসেন বলেন, কলোনীর একটি তিন তলা ভবনের নিচ তলার একটি কক্ষে বিস্ফোরণ হয়। পরে তিনজনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সেখানে ২৪ বছর বয়সী ওমর ফারুককে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন বলে মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নুরুল আলম আশেক জানান।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোখলেসুর রহমান জানান, যখন বিস্ফোরণ ঘটে, ফারুক তখন ওই ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। বিষ্ফোরণের ফলে দেয়াল ভেঙে তার গায়ে পড়ে।

যে ঘরে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেখানে ফোরকান উল্লাহ (৬০) ও মো কালাম (৩০) নামে দুজন ছিলেন। তাদের দগ্ধ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

আহতদের মধ্যে ফোরকানের শরীরের ৪৫ ও কালামের শরীরের ৬০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে বলে চিকিৎসকের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা পৌনে ১১টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে বিষ্ফোরণ হয়ে আগুন লেগে যায়। এসময় ঘরের দেয়ালও ভেঙ্গে যায়। তারা আহত তিন জনকে উদ্ধার করে অটো রিকশা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। 

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, তিন তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় মসজিদ ও তৃতীয় তলায় মাদ্রাসা আছে। নিচ তলায় ছোট ছোট ১৪টি কক্ষ আছে। সেখানে নিম্ন আয়ের লোকজন ভাড়া থাকেন। ভবনের নিচ দিয়ে যেতে হয় কাশেম কলোনীতে।

পুলিশ বলছে, ঘরের ভেতর কোনো বিস্ফোরক দ্রব্যের আলামত পাওয়া যায়নি। কোনোভাবে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্টিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিসেস) রওনক উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস লাইনে কোনো ত্রুটি তারা পাননি। চুলা ও লাইন অক্ষত ছিল।

“ঘরে ভেন্টিলেশন সুবিধা নেই। এমনকি গ্যাসের চুলার পাশেও কোনো জানালা নেই, যার কারণে ঘরের মধ্যে গ্যাস জমে ওই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।”