সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের সামর্থ্য বাড়াতে হবে: তৌফিক খালিদী

মহামারীর মধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জীবনযাপনে হিমশিম খাচ্ছে বহু পরিবার। ফলে সরকারের ভর্তুকি মূল্যে পণ্য নেওয়ার জন্য সারি হচ্ছে বড়। ফাইল ছবি
কোভিড মহামারী থেকে পরিত্রাণের চেষ্টার মধ্যে ইউক্রেইন যুদ্ধ অর্থনীতিতে সামগ্রিক যে সঙ্কট তৈরি করেছে, তা থেকে উদ্ধারে সরকারের সামর্থ্য বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে বৃহস্পতিবার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে মতবিনিময় সভা করেন, তাতে এই পরামর্শ দেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক।

সঙ্কটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আমাদের অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানোর মতো নীতি প্রণয়ন করতে হবে, আর ভবিষ্যতের যে কোনো সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের সামর্থ্যকে শক্তিশালী করতে হবে।”

সময়টি যে অন্য যে কালের চেয়ে আলাদা, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে তা উপলব্ধি করে গতানুগতিকতার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শও দেন তিনি।

অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদারের সঞ্চালনায় ভার্চুয়াল এই মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোর শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকরা অংশ নেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কোভিড-১৯ মহামারী ও ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় বিভিন্ন পরামর্শ দেন তৌফিক খালিদী।

বৈশ্বিক সঙ্কটের অভিঘাতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে লাগা ধাক্কার বিষয় মনে করিয়ে সেসব ক্ষেত্রে উত্তরণের জন্য বাজেটে পরিকল্পনা সাজানোর পরামর্শ আসে তার আলোচনায়। 

তৌফিক খালিদী বলেন, “এটা হওয়ার কথা ছিল কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের অর্থবছর। কিন্তু আচমকা আরেক সঙ্কটের মুখোমুখি হয় বিশ্ব।

“ইউক্রেইনে রাশিয়ার অভিযান অনেক কিছুই বদলে করেছে, সেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। বিশ্ব অর্থনীতি ধসের ঝুঁকিতে। দাম বাড়ছে সব কিছুর, জ্বালানি সরবরাহ হুমকিতে, সবার আয়-রোজগার হয়েছে সঙ্কুচিত।”

এমন পরিস্থিতিতে অর্থবছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সাজানোর পরামর্শ দেন তৌফিক খালিদী।

তিনি বলেন, “এই বছর হতে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার বছর, কৃচ্ছ্রতার বছর। আগের বছরগুলোতে আমরা যেভাবে খরচ করেছি, সেভাবে করতে পারব না।

“কর বসাও আর ব্যয় কর- এমনটা করা যাবে না, এটা এবার নিশ্চিত করে বলা যায়। আমরা আশা করতে পারি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দামের অভিঘাত থেকে রক্ষার পরিকল্পনা আপনি দেবেন। কেননা, কিছু কিছু জিনিসের দাম অনেক বেড়ে গেছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ফাইল ছবি

তৌফিক খালিদী বলেন, “আমরা দেখতে চাইব, মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং যুদ্ধের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কীভাবে পরিকল্পনা নেয়।

“আমাদেরকে প্রায়ই এই অঞ্চলের দুটি দেশ শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উভয় দেশই এখন খাদের কিনারায়।”

দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পে তিন বার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনার পরামর্শ দেন তিনি। সরকারের জবাবদিহিতার স্বার্থেই এটা প্রয়োজন বলে তার মন্তব্য।

আর্থিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্নও সামনে আনেন তৌফিক খালিদী। জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি এবং স্বাস্থ্যে যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, বাজেট পরিকল্পনায় তা গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।

ইউক্রেইনে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তাতে সরকারকে নতুন করে ভাবার পরামর্শ দেন তৌফিক খালিদী।

“স্থানীয় বাজারেও দামে রেকর্ড হয়েছে। যা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ভঙ্গুর অবস্থাকেই নির্দেশ করছে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে আমাদের নিজেদের রক্ষা করা যাবে? এটা আমাদেরকে করতে হবে।”

দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ‘স্বস্তিদায়ক’ পর্যায়ে থাকলেও বর্তমানের কিছু সঙ্কেত যে সতর্ক হতে বলছে, তা মনে করিয়ে দেন তিনি।

তৌফিক খালিদী বলেন, গত নয় মাসে রেমিটেন্স ২০ শতাংশ কমেছে, এটা ভালো লক্ষণ নয়। রপ্তানি বাড়ছে, তার সঙ্গে আমদানি ব্যয়ও। ডলারের মূল্য একশ টাকা ছাড়িয়েছে। এটা সম্ভবত অপ্রত্যাশিত ছিল না। বেশি কিছুদিন ধরে এমন অনুমান করা হচ্ছিল।”

“আপনার মন্ত্রণালয় গত কয়েকদিনে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তার মানে আরও সামনে এগোতে প্রস্তুত আপনারা।”

“দুশ্চিন্তার অনেক কিছু আছে! আমি কেবল আপনাদের জন্য শুভকামনা করতে পারি। আমার আশা, আপনি এসব থেকে উত্তরণ ঘটাবেন,” বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সবার পরামর্শের সংযোগ ঘটিয়ে সঙ্কট উত্তরণের পরিকল্পনা করবেন তিনি।

“অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাব। সবাই মিলে একসাথে কাজ করব। এবার যা দেখতে পেয়েছেন, আগামীতে আরও স্ট্রংলি কাজ করব। আমাদের বাজেট হবে রেসপনসিবল, অ্যাকাউন্টেবল অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্ট।”