পাহাড় কেটে সাদামাটি আহরণে ধোবাউড়ায় ‘পরিবেশ বিপর্যয়’

পাহাড়-টিলা কেটে সাদামাটি উত্তোলনের ফলে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি পাহাড়ি বনের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতির অভিযোগ করে তা বন্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে।

চলতি মাসে নেত্রকোণার দুর্গাপুর ও ধোবাউড়ার সাদামাটি এলাকা পরিদর্শনের পর শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে এ দাবি জানায় নাগরিক প্রতিনিধি দল।

মতবিনিময়ে ‘অপরিকল্পিত উপায়ে’ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বন্ধ করার পাশাপাশি ওই এলাকার বসবাসকারী হাজং, মান্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনেরও দাবি জানানো নয়।

সভায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

তিনি জানান, ধোবাউড়ার ভেদীকুড়া মৌজায় সাদামাটি উত্তোলনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি, পাহাড় ও পাহাড়ি বনের ওপর নির্ভরশীল হাজং, মান্দি ও অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

ওই এলাকার স্থানীয় নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বক্তব্য তুলে ধরে অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, “বন ও গাছপালা ধ্বংসপ্রাপ্ত, বহু বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন, পানি দূষণ, খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে।

“খননের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় কৃষিকাজ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, ভারী যানবাহনের কারণে শব্দ দূষণ ও রাস্তাঘাট ভেঙে পড়ার মত ঘটনা ঘটছে।

“যে পাহাড় ও বন এই অঞ্চলের জানা ইতিহাসের পুরোটা সময় হাজং, গারো ও অন্যান্য আদিবাসীদের জন্য ছিল বাসযোগ্য নিজস্ব আবাসভূমি, সেটাই এখন অপরিকল্পিত ও নির্বিচার সাদামাটি আহরণের ফলে ক্রমশ অবাসযোগ্য হয়ে উঠছে।”

এ শিক্ষক জানান, ক্ষু্দ্র-নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠনের আহ্বানে ঢাকা থেকে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ৮, ৯ ও ১০ এপ্রিল নেত্রকোণার দূর্গাপুর ও ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় সাদামাটি পাহাড় পরিদর্শন করে।

দলটি উপেজলার কয়েকটি গ্রামে গিয়ে স্থানীয় হাজং, মান্দি ও বাঙালি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া দূর্গাপুর প্রেসক্লাবে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মতবনিমিয় করে এবং নেত্রকোণা জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও দেখা করে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই দুর্গাপুর উপজেলার মেজপাড়া, আরাপাড়া ও পাচকানাইহা মৌজা থেকে পরিবেশ ছাড়পত্র ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ছাড়া নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কেটে সাদামাটি আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। 

নেত্রকোণায় অপরিকল্পিত খনিজ সম্পদ আহরণ বন্ধের দাবি  

সে সময় হাইকোর্ট এ ধরনের কাজকে জনস্বার্থ পরিপন্থি বলে আখ্যা দেয়। আদালতের এই নিষেধাজ্ঞার পর দুর্গাপুরের ওই মৌজাগুলোয় সাদামাটি আহরণ প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।

দূর্গাপুরে নিষিদ্ধ করার পর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় একই কায়দায় অপরিকল্পিতভাবে টিলা কেটে এখন সাদামাটি উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

“আমরা সাদামাটি উত্তোলনের বর্তমান এলাকা পরিদর্শন করে দেখেছি যে, দুর্গাপুরের তিনটি মৌজায় যেভাবে সাদামাটি আহরণ কাজ পরিচালিত হত তার থেকে ধোবাউড়ায় খননকাজে বস্তুত কোনো পার্থক্য নেই।

“রাষ্ট্রীয় আইন, বিধিবিধান ও প্রটোকল অগ্রাহ্য করে টিলা কেটে চলছে সাদামাটি আহরণ।”

ওই এলাকার পরিবেশ ও জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “পরিদর্শনকালে আমরা জানতে পেরেছি, সাদা মাটি উত্তোলনের জন্য ধোবাউড়া উপজেলায় আরও কয়েকটি টিলা কিনে ফেলা হয়েছে, যদিও এখনও খনন শুরু হয়নি।”

হাইকোর্টের নির্দেশের দুবছর পরও দুর্গাপুরের মানুষ এ পর্যন্ত সাদা মাটি উত্তোলনের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

“প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করায় সেখানকার পরিবেশ এখন ভয়ঙ্কর ও বীভৎস। কোনো শৃঙ্খলার লক্ষণ কোথাও নেই।”

একসময়ের টিলা এখন গভীর খাদে পরিণত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “খোলা খাদে কোনো সতর্কবার্তা নেই। এসব খাদ এবং কোনো কোনো খাদে জমে থাকা পানিতে পরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশু ও পর্যটক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

“স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৩৭ জন মানুষ এসব মৃত্যুকূপে পতিত হয়ে মারা গেছেন।”

দুর্গাপুর ও ধোবাউড়ায় সাদামাটি আহরণের ফলে সে এলাকায় বসবাস করা ক্ষু-নৃগোষ্ঠীর মানুষ ও বাঙালিরা বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে দাবি করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এ শিক্ষক।

দূর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের নেথপাড়া গ্রাম থেকে হদি জনগোষ্ঠীর একটি পাড়া পুরোপুরি উচ্ছেদ হয়ে গেছে বলে জানান রোবায়েত ফেরদৌস।

স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রতিনিধি দলের পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “গত দুই দশকে কয়েক দফা বাস্তুচ্যুতির ফলে এসব পরিবারের কোনো হদিসও আর এলাকাবাসী দিতে পারেননি।

“অন্যদিকে, একই উপজেলার রানীখং ইউনিয়নের বগাউড়া গ্রাম থেকে গত ১৫ বছরে ১১টি হাজী পরিবার নিজভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।”

এসময় দুর্গাপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরী নদী থেকে বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন নাগরিক প্রতিনিধি দলের অন্যতম এই সদস্য।

“বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান ও প্রটোকল মেনে চলা উচিত। বালুর ট্রাক চলাচলের ফলে দুর্গাপুরবাসী প্রতিদিন যে দুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির শিকার হন তা লাঘব করার জন্য বাইপাস সড়ক নির্মাণ খুব জরুরি।”

দূর্গাপুর ও ধোবাউড়ায় সাদামাটি উত্তোলনের ফলে তৈরি হওয়া বিপর্যয় এড়াতে সরকারের কাছে কিছু দাবি তুলে ধরে এই নাগরিক প্রতিনিধি দল।

>> পরিবেশগত সুরক্ষার প্রশ্ন বিবেচনায় না নিয়ে অপরিকল্পিত ও ধ্বংসাত্মক উপায়ে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের যে আয়োজন তা বন্ধ করতে হবে।

>> সাদামাটি উত্তোলনের ফলে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে হবে। সেই সঙ্গে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

>> পরিবেশ-প্রতিবেশগত ভারসাম্য ধ্বংসের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

>> পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে ভারসাম্যহীনভাবে যেভাবে খননকাজ করা হয়েছে এবং খননের পর বিদ্যমান কোনো প্রটোকল না মেনে সংশ্লিষ্ট জায়গা যেভাবে ফেলে রাখা হয়েছে, সেটা পুনরায় জীববৈচিত্র্যের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে এবং এর আর্থিক দায়ভার খননকারী প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।

>> এই পর্যন্ত যারা নিহত হয়েছেন সেই সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। অবিলম্বে সেখানে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।

>> প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনজীবন ও প্রতিবেশের উপর যেন প্রতিকূল প্রভাব না পড়ে তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। খনন কাজের সময় স্থানীয় পর্যায়ে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং থাকা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটন ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকাও খুব দরকার।

>> মাটি উত্তোলনে নিয়োজিত শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি প্রাপ্তি এবং স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য বিদ্যমান আইএলও কনভেনশন একদমই মানা হচ্ছে না। শ্রমিকদের এই স্বার্থের বিষয়টিও দেখার জন্য আমরা দাবি জানাচ্ছি।

নাগরিক প্রতিনিধি দলেরে অন্যান্য সদস্যরা হলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, আইনজীবী ও সাংবাদিক প্রকাশ বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন, সাংবাদিক নজরুল কবীর, সাংবাদিক ও গল্পকার রাজীব নূর, অনুবাদক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ হাবীব, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী অনামিকা আহমেদ ও নাগরিক উদ্যোগের প্রতিনিধি ফারহান হোসেন জয়।