শুনতে কি চাও অঞ্জন দত্তের গান?

ছবি: ফেইসবুক থেকে।
কালিম্পং কিংবা দার্জিলিং’য়ের নয়, অঞ্জন দত্ত বাংলা গানের শিল্পী।

বাংলা গানের ধারা পরিবর্তন করে দেওয়া শিল্পীদের মধ্যে অঞ্জন দত্তের নাম আসবেই। নব্বইয়ের দশক থেকে এখনও তার গান চলছে। এই শিল্পীর জন্মদিনে শুভেচ্ছা লেখা লিখলেন আরাফাত শান্ত।

এটা খুব স্বাভাবিক যে বড় হওয়ার পর আমার কবীর সুমন বেশি ভালো লাগে। কারণ কবীর সুমনের গানের কথা কাব্যময়তা আকুলতা এইসবের সঙ্গে কারোর তুলনা চলে না। কবীর সুমনের অতি সাধারণ গানের যে কথার শক্তি তা বিস্ময়কর।

অতি সাধারণ স্যাটায়ার ধরনের গান 'হেলিকপ্টার'। তার লিরিকে কি বলা- ভোট দিয়েছিস, ভোট দিয়েছো, ভোট দিয়েছেন, ভোট মানুষের মুখে ব্যালট পেপার দেখছেন, নেতা দেখছেন।

পরিচালক সৃজিত ঠাট্টা করে বলছিলেন, “সুমনদার বাসা অদ্ভুত, ব্রাশ করতে করতে সকালে উনি যা লিখে ছিড়ে ওয়েস্টবিনে ফেলে দেন, তার ভেতরে খুঁজলেও প্রকাশযোগ্য ভালো কবিতা বেরুবে।”

তাই কবীর সুমনের সঙ্গে আমি অঞ্জনের তুলনার বোকামীতে যেতে চাই না।

নচিকেতার সঙ্গেও অঞ্জন দত্তের তুলনা চলে না, নচিকেতা সত্যিকারের আধুনিক বাংলা গানের শিল্পী। বাংলা গানের যে শত বছরের ট্রাডিশান তা তার কন্ঠে, তার সঙ্গে বরং তার নিজের যন্ত্রণা, যুগের যন্ত্রণা সব এসেছে। শুধুমাত্র হারমোনিয়াম বাজালেও নচিকেতা অমর হয়ে থাকতেন গানের ভূবনে।

তাহলে অঞ্জন দত্ত কই থাকবে? বলা বাহুল্য অঞ্জন দত্ত কখনই গান গাইতে চাইতেন না। গান শুনতেন। সব ধরনের গানই শুনতেন। তিনি মনেপ্রাণে বড় অভিনেতাই হতে চাইতেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকম’য়ে বছর ছয় আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,  “বিখ্যাত হতে চাইতাম। অনেক কিছু করলেও গানই আমাকে বিখ্যাত বানিয়েছে।”

মঞ্চ নাটকের কিংবদন্তী বাদল সরকারের যোগ্য শিষ্য ছিলেন। মৃণাল সেনের ছবি করে নামও করেছিলেন। ভালো ইংরেজি লিখতে পারতেন। কিন্তু তেমন কেউ তাকে চিনতো না। তিনি বাংলা ছবি পরিচালকদের ঘরে গিয়ে লুচি পাঠার মাংস খেয়ে আসতেন কিন্তু তাকে ভালো রোল কেউ দেয় নাই।

সুমনের গান শুনে ভাবলেন, তিনিও তো আগে টুকটাক গাইতেন, চেষ্টা করা যাক। তারপর তো ইতিহাস, অঞ্জন দত্তের পপুলারিটি নিয়ে কারও ধারণাই নাই।

অনেক কাল আগে নওগাঁ গিয়েছিলাম, নিতান্তই অজপাড়া এক মফস্বল। আমি আর আমার বন্ধু হাঁটছি, এক ছেলে মনের আনন্দে গাইছে, ‘হরিপদ এক জন ছোটোখাটো সাদামাটা লোক।’

আমি খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম, কলকাতার এক গিঞ্জি মেসের অম্বলে ভোগা হরিপদ কেরানি এই নওগাঁর প্রত্যন্ত গ্রামে এসে পড়াটা দেখে।

অঞ্জন দত্তের গান আমাদের জীবনের প্রথম প্রেমের মতো। কিছু ভাবতে হয় না, এমনি এমনি মায়া বাড়ে। যে একবার শুনবে তার কিছু গান মনে গাঁথবেই।

অঞ্জন দত্তের একটা গান ভাবেন, ধরেন সেটা, 'চ্যাপ্টা গোলাপফুল'। এই হোয়াটস্যাপ মেসেঞ্জারের যুগে এই গান আমি এখনকার ছেলে মেয়েদেরও গাইতে দেখছি।

এই যে রিলেট করার ক্ষমতা, সবার জীবনে দখল নেওয়া এটা অঞ্জন ছাড়া আর খুব কম শিল্পী পেরেছেন। যতদিন বাঙালি মধ্যবিত্ত থাকবে ততদিন অঞ্জন থাকবে।

আমিও জানি অঞ্জন দত্তের কিছু গান সুর বিদেশি গান থেকে নেওয়া, কিছু আইডিয়া হয়ত মৌলিক না, এইসব দোষ ভুলে যাবেন যখন অঞ্জন দত্তের গান শুনবেন।

চন্দ্রবিন্দু তখনও নাম করেনি, তারা খুঁজছিল এরকম শিল্পী যার নাম আছে, টিকেট বিক্রি নিশ্চিত হবে, তারাও গান গাইবে। অঞ্জন দত্তকেই তারা পেয়েছিলেন।

মিটিংয়ে দেখা যেত অঞ্জন দত্ত তাদের বাড়ি খুঁজে এসে দিব্যি গপ্প করছে, অথচ উৎপল অনিন্দ্যরা তখনও ঘুম থেকেই উঠেনি। এই হল অঞ্জন দত্ত।

এত কথা লিখলাম, কারণ ১৯ নভেম্বর ছিল অঞ্জন দত্তের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন মায়েস্ত্রো। উপভোগ করুন জীবন, আর সিনেমা বানান আরও ভালো ভালো। ফাটিয়ে অভিনয় করুন।