‘তুই একটা অপদার্থ!’

‘তুই একটা অপদার্থ, তোকে দিয়ে কিছুই হবে না’, কথায় কথায় অনেক অভিভাবক শিশু-কিশোরদের এভাবে বকেন।

হয়তো বাবা-মায়ের মেজাজ খারাপ তখন এভাবে বকেন, কিংবা হয়তো কোন কারণে শিশুরা কথা শোনেনি তখনও। যে ছেলেটা ক্লাসে প্রথম-দ্বিতীয় হয় না তাকে যেমন এমন বকা খেতে হয় তেমনি যে খুব ভালো ফল করে তাকে হয়তো অন্য কোন কারণে এমন বকা খেতে হয়!

অভিভাবকরা যখন এভাবে বকা দেন তখন অনেকে ধরে নেয়, ছেলে বা মেয়েটা বুঝি আসলেই অপদার্থ। এমনকি যাকে বকা দেওয়া হয় সেও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। আসলে তো পৃথিবীর প্রত্যেকটা শিশু-কিশোর অসীম সম্ভাবনাময়। সেখানে যদি আদৌ কেউ অপদার্থ হয় তার দায় কার? পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্র-সমাজ সবার ভূমিকা কী? আমরা কী আসলেই আমাদের সন্তানদের যথাযথ বড় করছি? শিশু-কিশোরদের কী করে বোধসম্পন্ন লড়াকু মানুষ বানাবো আমরা? চলুন একটু ভাবি। 

ঢাকার ইংরেজি মাধ্যম কিংবা ভালো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকান। আপনি দেখবেন অনেক বাবা-মা ছেলেমেয়ের সব কাজ করে দিচ্ছে। এমনকি বড় হওয়ার পরও দেখবেন তারা মেডিকেল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাবে, বাবা-মা হাজির। রোজ সকালে সন্তানের স্কুলের ব্যাগ যে বাবা-মা টেনে দেয়, সন্তানকে যে স্বাবলম্বী হতে শেখায় না সেই সন্তান কী করে আত্মবিশ্বাসী হবে? কী করে এই জগতে লড়াই করতে শিখবে?

আসলে অনেকেই শিশুদের একা পথ চলতে শেখান না। সেটা করতে হবে। শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে তাদের কাজ তাদের করতে দিতে হবে। অনেক বাবা-মায়েরা আবার ভাবেন, কমপ্ল্যান, বর্নভিটা, হরলিক্স, ফাস্ট ফুড আর দামি দামি খাবার খেতে দিলে হাড্ডি মাংস সবল হবে। কিন্তু আসলে তখন শিশুরা মিল্ক ইনজুরির শিকার হয়। থলথলে তুলোর বস্তার মতো শিশু। না আছে শক্তি, না আছে সাহস। এই শিশুরাই আবার যখন কান্না করে তখন তাদের থামাতে আমরা হাতে ধরিয়ে দেই মোবাইল-ট্যাব। এদের শৈশব-কৈশোরে লড়াই থাকে না।

শিশুদের অতি আদর করতে নেই। চিকিৎসকরা বলে থাকেন, শিশু যখন মাটিতে গড়াগড়ি খায়, তার শরীরের ইমুনিটি গ্রো করে। অথচ আজকাল শহরের অনেক শিশুকে মাটির ছোঁয়া পেতেই দেন না বাবা-মায়েরা। ফলে বডি ইমুনিটি আসবে কীভাবে? আবার কাদা মাটিতে যে শিশুরা খেলবে সেই মাটিও কী খুব সহজে মেলে?

চারপাশে তাকান। উন্নয়নের জোয়ার। আকাশচুম্বি সব ভবন উঠছে। কিন্তু খেলার ব্যবস্থা নেই। শিক্ষা যেন পণ্য। স্কুল আছে খেলার মাঠ নেই। শিশুদের দৌড়ানোর জায়গা নেই। নিজের ছায়া দেখেও শিশুরা ভয় পায়। এসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ থাকতে হবে।

আমাদের যেমন সন্তানদের লড়াই করতে শেখাতে হবে তেমনি শেখাতে হবে মূল্যবোধ। আজকাল অনেক বাবা-মা যেটা করেন তারা সন্তানদের লড়াই করতে না শিখিয়ে তাদের জন্য অনেক সম্পদ বা টাকা পয়সা রেখে যেতে চান। দেশে-বিদেশে বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট বা সেভিংস। উদ্দেশ্য ছেলে-মেয়েরা যেন আরামে বসে খেতে পারে।

এতে কিন্তু বিপদ বাড়ে। কারণ সম্পদ আয় করতে গিয়ে অনেক সময় অসৎ আয়ে চলে যান অনেকে। ভাবেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য করছেন। আর এভাবেই একটা সন্তানের ক্ষতি হয়ে যায়। কারণ আপনার কষ্টের টাকায় সন্তান আরাম করে যখন খাবে, সে যখন জানবে তার জন্য ভবিষ্যতে অনেক সম্পদ আছে তখন কিন্তু সে আর কষ্ট করে আয় করা শিখবে না।

ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালাদের কিংবা সম্পদওয়ালাদের সন্তানদের দেখুন। তাদের মধ্যে কয়জন লেখাপড়া শিখে সত্যিকারের শিক্ষায় মানুষ হচ্ছে? আবার উল্টো করে দেখুন, প্রায়ই শুনবেন কিছু না থাকার পরেও রিকশাওয়ালার সন্তান বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। আসলে জীবনে সংগ্রাম থাকলে জীবনযুদ্ধে সফলতা আসে। ভালো করে তাকালে দেখবেন, এই বাংলাদেশের নানা পেশায় যেসব সফল মানুষ আছেন হোক তিনি সরকারি বা বেসরকারি চাকুরে কিংবা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার দেখবেন একটা বড় অংশই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন যাদের জীবনটা লড়াই করে কেটেছে।

একটু তুলনা করলেই দেখবেন, কমপ্ল্যান- হরলিক্স আর পিৎজা খাওয়া শিশুদের বদলে লড়াই করে বড় হওয়া নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্তের সন্তানরা বেশি আত্মবিশ্বাসী। কাজেই সন্তানদের লড়াই করা শেখান। শহরে থাকলে মাঝে মধ্যে গ্রামে নিয়ে যান। মাটির সাথে সম্পর্ক গড়ে দিন। ওকে সম্পদের প্রাচুর্য না দেখিয়ে অভাব আর সংগ্রামটাও বোঝান। সময় দিয়ে সুশিক্ষিত ও কর্মঠ করে যান। নিজের আয় নিজে খেয়ে যান। বংশসূত্রেই সুখি হবেন। আপনারা সন্তানটাও লড়াই করা শিখবে।

আমার বাবা শৈশব-কৈশোরে একটা কথা সবসময় বলতেন। তিনি আমাদের শেখাতেন, এই যে বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ যেগুলো দেখা যায় সেগুলো আসলে সম্পদ নয়। কিন্তু যেগুলো দেখা যায় না শিক্ষা, জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, সততা মানবিকতা এগুলো আসল সম্পদ। কাজেই সন্তানদের জন্য সম্পদ যতো কম রাখতে পারবেন ততো ভালো। শিশুদের লড়াই করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধগুলো শেখাতে হবে। আর এই মূল্যবোধ শেখার সবচেয়ে বড় জায়গা পরিবার। মনে রাখতে হবে সফলতা মানে অর্থ সম্পদ গড়া নয়, সফলতা মানে মানুষের পাশে থাকা।

কথায় কথায় অনেক বাবা-মা বলে থাকেন, ওমুক তো ফার্স্ট হচ্ছে, তুমি কেন পারছো না? ওমুকে পারলে তুমি কেন পারবে না? এই যে সবসময় প্রতিযোগিতা শেখানো হয় সেই প্রতিযোগিতা শেখানোর চেয়েও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। বিপদে যেন আরেকজনের পাশে দাঁড়ায়, নিজের খাবার যেন আরেকজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে, কারো বিপদ দেখে যেন না পালিয়ে যায়। সৎভাবে যেন বাঁচে, সবসময় যেন দেশের সেবা করে। মানুষের সেবা করে।

কিন্তু কথা হলো বাবা-মায়েরা সন্তানদের বললেই কী এগুলো শিখে যাবে? সন্তানকে যতোই ভালো উপদেশ দেই না কেন, ওরা কিন্তু আমাদের জীবন অনুসরণ করবে, উপদেশ নয়। কাজেই মানবিক মূল্যবোধের সব কথা বলার পাশাপাশি নিজেরাও সেগুলোর চর্চা করতে হবে। আপনি অসৎ পথে আয় করবেন, হারাম খাবেন আর সন্তানকে সততার কথা বলবেন তাতে কিন্তু কাজ হবে না। আপনার সন্তান যখন দেখবে আপনি একটা চাকরি করেন, কিন্তু বেতনের চেয়ে আপনার খরচ বেশি, ঘুষের আয়, আপনার সন্তান কিন্তু আপনাকে শ্রদ্ধা করবে না। তার মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি হবে না।

আমাদের শিশুদের যতোই ভালো কথা আমরা বলি না কেন ওরা কিন্তু আমাদের কথা শুনবে না, বরং আমরা কী করি তাই দেখবে। সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ ছোটবেলা থেকেই সারা বিশ্বের পরিবেশ নিয়ে ভাবছে। পৃথিবীকে বাঁচাবার জন্য লড়ছে। এটা কিন্তু একদিনে হয়নি। সে ছোটবেলায় তার চারপাশ থেকে শিখেছে কেন পরিবেশের যত্ন নেওয়া জরুরি। কিন্তু আমাদের এখানে আমরা কী করি? আমাদের শিশু-কিশোররা কাদের দেখে শিখবে?

চারপাশে আমরা গাছ কাটছি, নদী-খাল দখল করছি, আরেকজনের সম্পদ দখল করছি, সবসময় শুধু নিজের কথা ভাবছি! এগুলো দেখে বড় হলে আমাদের সন্তানরা কী শিখবে? জাপানে কিন্তু ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় বাসে বা ট্রেনে কোন মাকে দেখলে কিংবা কোন বৃদ্ধ সিট ছেড়ে দিতে হবে। মানুষের কথা ভাবতে হবে।

জাপানের একটা ঘটনাই বলি। করোনাভাইরাস মহামারীতে বিভিন্ন দেশের মানুষের দুর্দশা সম্পর্কে জানতে গিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের কথা জানতে পারে জাপানি চার শিশু- সুজুকি, আন, তাইকি ও ইয়ুকি। এদের সবার বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। সবাই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে থাকা শিশুদের জন্য ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ নামে তহবিল খোলে।

শুরুতে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ১ লাখ ইয়েন বা আনুমানিক ৯০০ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করে সেই টাকায় লেখাপড়ার সামগ্রী কিনে বাংলাদেশে পাঠানো। কিন্তু তাদের উদ্যোগের কথা শুনে তিন মাসে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন ডলারের (৩০ লাখ ইয়েন) বেশি অর্থ জমা পড়ে তহবিলে। তহবিলে জমা হওয়া অর্থ কীভাবে খরচ করলে ভালো হবে, সেই উপদেশ নিতে দলের সবচেয়ে বড় সদস্য- ১২ বছর বয়সী সুজুকি টেলিফোনে বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতোর সঙ্গে কথা বলে। রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে সোমা। রাষ্ট্রদূতের পরামর্শে মোট জমা হওয়া অর্থ কয়েকটি অংশে ভাগ করে প্রতি তিন মাস অন্তর বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় শিশুরা।

জাপানের দৈনিক পত্রিকা মায়নিচি শিম্বুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই চার শিশুর এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য তারা ‘সিটিজেন অব দ্য ইয়ার’পুরস্কার পেয়েছে।

আরেকটা ঘটনা শুনুন। ১১ বছর বয়সী একটি শিশু জানতে পারে তার ক্যানসার এবং সে আর বাঁচবে না। ওই শিশুটি মারা যাওয়ার আগে একটি শিশুকে তার কিডনি এবং আরেকটি শিশুকে তার চোখ দান করে যায়। এই শিশুটির মৃত্যুর পর ডাক্তার এবং নার্সরা মাথা নিচু করে শিশুটিকে সম্মান জানায়।

পৃথিবীর বড় বড় মহৎ মানুষদের জীবনী পড়ে দেখবেন, এই পৃথিবীর যারা বড় মানুষ বেশিরভাগই শৈশব-কৈশোর থেকে পৃথিবী আর মানুষ নিয়ে ভাবতেন। তারা সেই মূল্যবোধ শিখেছেন পরিবার, স্কুল কিংবা আশপাশ থেকে। একবার ভাবুন তো আমরা সবসময় কী নিয়ে আলোচনা করি, কী দেখে আমাদের সন্তানরা চারপাশে? কয়জন আমরা আরেকজনের বিপদে দাঁড়াই? কয়জন নারীদের সম্মান করি। আমাদের সমাজ আমাদের কী শেখাচ্ছে? এলাকায় কাদের দাপট? আমাদের শিশু-কিশোররা কাদের দেখে শিখবে? তাদের সামনে আইকন কে?

আমাদের সবার মনে রাখা উচিত, আমরা নিজেরা ভালো না হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ভালো করা কঠিন। কাজেই চলুন আমাদের সন্তানদের আমরা ভালো মানুষ বানাই। মূল্যবোধ শেখাই। আর সবার আগে সেটা পরিবার থেকেই করতে হবে। আর সেটা শেখাতে হলে নিজেদের মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। চলুন আগে নিজেদের বিবেক জাগ্রত করি।

মনে রাখতে হবে আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি বলেই আমরা মানুষ। আরেকজনের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমরা যে কষ্ট করি সেটার নামই মানবতাবোধ। এই বোধ না থাকলে যতো সফলই হই না কেন দিনশেষে আমরা মানুষ হতে পারবো না। আর মানুষ হতে না পারলে যতো বড় পদার্থ বা অপদার্থই হই না কেন সবকিছু বৃথা। নিশ্চয়ই আমরা সবাই মানুষ হতে চাই। কাজেই সেই পথেই হোক আমাদের গন্তব্য।

 

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

 

কিডজ পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!