রূপপুরে রুশ দর্শন: কাঁদি কাঁদি কলা আর রুশ ভাষায় ভিক্ষা চাওয়া

রূপপুরের ভিক্ষুক সান্টুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম- “রাশিয়ানদের কাছে কোন ভাষায় ভিক্ষা চান?” তিনি একটু হেসে বললেন, “ওদের ভাষায়।”  ঠিক কী বলেন- এ প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিলেন, “বন্দু খা খা।”

আনুমানিক ৫৫ বছর বয়সী, পঙ্গু সান্টুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের এক শুক্রবারে, পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরতদের জন্য তৈরি সুউচ্চ ভবনগুলোর পাশের রাস্তায়। এলাকাটি এখন গ্রিন সিটি, নতুন হাট নামেই পরিচিত।

সান্টুর বাড়ি ঈশ্বরদী সদরেরই একটি গ্রামে। সদর উপজেলায় ব্যাংকের সামনে ভিক্ষা করেন তিনি। সাপ্তাহিক বন্ধের দুই দিন শুক্র-শনিবার রূপপুরে আসেন ভিক্ষা করতে। ভিক্ষা করতে ‘রাশিয়ান’ ভাষা তিনি শিখেছেন অন্য ভিক্ষুকদের কাছ থেকে।   

তিনি বলেন, “রাশ্যানরা মানুষ ভালো। প্রতি তিনজনে একজন ভিক্ষা দেয়। দশ টাকা দেয় কম করে। দিনে চারশ’- পাঁচশ’ ট্যাকা থাকে। ”

রুশ ভাষায় ভিক্ষা চাওয়ার ব্যাপারটিতে শুরুতে চমকে গেলেও, বেশিক্ষণ সেটি স্থায়ী রইল না।

কিছুদূর এগোতেই আরেক ভিক্ষুককে তিন পথচারী বিদেশি নাগরিকের কাছে ভিক্ষা চাইতে দেখে বুঝলাম, সান্টুর ‘বন্দু খা খা’ আসলে বাংলার রুশ সংস্করণ। বাক্যটি হচ্ছে- ‘বন্ধু খাবো, খাবো’।

রূপপুরের স্বপ্ন পূরণে বড় অগ্রগতি, বসল প্রথম পরমাণু চুল্লিপাত্র  

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে কাজ করছেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাশিয়া, বেলারুশ, কাজাকস্তান ও ইউক্রেইনের দুই থেকে আড়াই হাজার কর্মী। পদ্মা নদীর পাশে মূল প্রকল্পের প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে এ প্রকল্পে কর্মরত বিদেশিদের থাকার জন্য ২০ তলার ২০টি ভবন নিয়েই গ্রিন সিটি।

আর এদের জন্যই সেখানে গড়ে উঠেছে বিপণি বিতান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং কাঁচাবাজার। দোকানগুলোয় বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি সব পণ্যের রুশ ভাষায় নাম ও দামের তালিকা টানানো রয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে দোকান গড়ে ওঠায় পণ্য বিক্রির ধরনেও এসেছে পরিবর্তন।

খাওয়ার পানি কেনার উছিলায় মুদি দোকানি মো. আবু তাহেরের সঙ্গে কথা হলো।

বিদেশিরা কী ধরনের পণ্য বেশি কেনে- সে প্রশ্ন করতেই তাহের বলেন, “এরা দুধ আর কলা খায়। খালি কলা খায়। বাস থেকে নাইমেই কাঁদি কাঁদি কলা কেনে। প্রতিদিন চার-পাঁচ মণ কলাই বিক্রি করি।”

কলা বিক্রির পরিমাণ শুনে অনেকটা বিস্মিত হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, “খালি আপনার দোকানেই এত কলা বিক্রি হয়?”

উত্তরে তাহের জানালেন, আশেপাশের সব মুদি দোকানেই কলা বিক্রির পরিমাণ এরকমই।

বছর দুয়েক আগে তাহেরের দোকান ছিল আরেকটু দূরে, লালন শাহ সেতুর কাছাকাছি। তখন দোকানটি ছিল অনেক ছোট। দিনে হয়ত এক হালি কলাও বিক্রি হত না বলেই জানালেন তিনি।

‘গ্রিন সিটি’র আগের নাম ছিল সাহাপুর। ‘নতুন হাট’ এলাকাটিও আসলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত বিদেশি নাগরিক বিশেষ করে ‘রুশ’-দের কারণেই গড়ে উঠেছে।

২০১৮ সালে প্রাচীর ঘেরা গ্রিন সিটির বিপরীত পাশেই গড়ে ওঠে ‘বিশ্বাস শপিং কমপ্লেক্স’। এ মার্কেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অলীপ বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হল।

তিনি বলেন, “বছর দুয়েক আগেও এখানে রাইস মিল ছিল। আশেপাশের এলাকাতেও বেশ কয়েকটি রাইস মিল ছিল। রাইস মিলের ব্যবসা তেমন না চলায়, এখানে মার্কেট বানিয়েছি।”

অলিপ জানালেন, তারা তিন ভাই এ মার্কেটের মালিক এবং সেখানকারই স্থানীয়।

‘বিশ্বাস শপিং কমপ্লেক্স’র সব দোকানের নামই বাংলার পাশাপাশি রুশ ভাষায় লেখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অলিপ বিশ্বাস বলেন, “রাশান ভাষায় দোকানের নাম দেওয়ার আইডিয়াটা আসলে দোকানদারদেরই। এখানে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই।”

‘বিশ্বাস শপিং কমপ্লেক্স’টি অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় রুশদের কাছে জনপ্রিয় কেন সে কারণ জানতে চাইলে অলিপ বিশ্বাস বলেন, “ওনারা সাধারণত বেশিদূর যেতে চান না। কাছেই মার্কেটটি হওয়ায় এখানেই বেশি আসেন।”

পাবনায় পদ্মার তীরে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়েক হাজার রুশ নাগরিকের পদচারণায় পরিবর্তন এসেছে স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায়। ছবি: রিয়াজুল বাশার

শপিং কমপ্লেক্স ঘুরে বেশ কয়েকজন দোকানির সঙ্গে আলাপ হলো। দোতলা মার্কেটের একতলায় কাজী ফার্মসের একটি ফাস্টফুডের দোকান রয়েছে। কথা হলো দোকানের ম্যানেজার ৩৬ বছর বয়সী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মার্কেটে কাজী ফার্মস এ দোকানটিই প্রথম দোকান।

বছর খানেক ধরে চালু হওয়া ফাস্টফুডের দোকানটিতে শুরু থেকেই রয়েছেন রফিকুল। রুশ ভাষায় কেমন আছো, কী খবর, শুভ সকাল- এমন অল্পকিছু বাক্যও এখন বলতে পারেন।

রফিকুল বলেন, “দোকানের বিভিন্ন খাবারের মেনু আসলে গুগল ট্রান্সলেট থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদ করে বানানো হয়েছে। বিদেশিদের মধ্যে কাজাকস্তান, বেলারুশ ও রাশিয়ার লোকেরা দোকানের কাস্টমার। তারা মূলত চিকেন ফ্রাই ও কফি খান। এছাড়া প্রচুর বাঙালিও আসেন।”

বিশ্বাস শপিং কমপ্লেক্স এর একতলাতেই আনুমানিক ৪৫ বছর বয়স্ক ‘সাবিহা বুটিক অ্যান্ড ভ্যারাইটি শপ’ নামের দোকানটির মালিক সাবিহা রহমান জানালেন, সাহাপুর অর্থাৎ গ্রিন সিটি এলাকাটি তার বাবার বাড়ির এলাকা। সেই সূত্রেই দোকান দিয়েছেন। এখানে দোকান দেওয়ার আগে ঈশ্বরদীতে স্বামীর কর্মস্থলে থাকতেন।

“এক বছর আগে এখানে দোকান দিয়েছি। মার্কেটের অ্যাডভান্স লাখ পাঁচেক টাকার কাছাকাছি। আর ভাড়া হাজার পাঁচেক। বছর খানেকে বিনিয়োগ করেছি লাখ পঁচিশেক টাকা। এখান থেকে খুব দ্রুতই বিনিয়োগ উঠে আসবে ইনশাল্লাহ। কেননা বেচাকেনা বেশ ভালো। রাশানরা আন্তরিক, কাস্টমার হিসেবে খুব ভালো।”

ঈশ্বরদীর রূপপুরের নতুন হাট মোড়ে এখন গেলে এটা রাশিয়া বলে ভ্রম হতে পারে। সব দোকানে বাংলার পাশাপাশি রুশ ভাষায় লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। কারণ এখানে ক্রেতাদের অধিকাংশই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত রাশিয়ার নাগরিক। ছবি: রিয়াজুল বাশার

সাবিহার দোকান ছাড়িয়ে মার্কেটের দোতলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে ‘আরকে লাইফ স্টাইল এক্সেসরিজ’ নামের একটি সানগ্লাসের দোকান। এর মালিক মোহাম্মদ রিপন বলেন, “হাজার খানেক টাকা থেকে সানগ্লাসের দাম শুরু। তবে আমি এই দোকান থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার সানগ্লাসও বিক্রি করেছি।”

দৈনিক বিক্রির পরিমাণ প্রথমে জানাতে চাইলেন না। পরে কথা প্রসঙ্গে বললেন, ৭০-৮০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হয় মাসে।

দোতলায় উঠতেই ‘এআরএস ফ্যাশন’র মালিক সুমন আলীর সঙ্গে কথা হলো। তিনি বলেন, “নিচতলায় আমার আরেকটি দোকান আছে। ব্যবসা ভালো বলে দোতলায় নতুন করে এ দোকানটি দিলাম।”

সুমন বলেন, “বছর দুয়েক আগে আমরা জনা দশেক লোক দোভাষী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিই। রোসেম কোম্পানির সুপার শপ চালানোর জন্য আমরা ওই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। মার্কেটে আরেকটি দোকান আছে বলে নতুন এ দোকানটির অ্যাডভান্স কম পড়েছে, সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো দিতে হয়েছে।”

এ দোকানেই কথা হলো রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে ঠিকাদারি পাওয়া রুশ প্রতিষ্ঠান তেস্ত রোসেম কোম্পানির কর্মী বেলারুশের নাগরিক ডেনিস-এর সঙ্গে। ডেনিসকে যে প্রশ্নই করি, উত্তর না দিয়ে তিনি মিষ্টি করে হাসেন।

পরে দোভাষী সুমন আলীর মাধ্যমে জিজ্ঞাসা করলাম পণ্যের দাম ও মান সম্পর্কে। ডেনিস বলেন, “গুড প্রোডাক্ট, চিপ প্রাইস।”

সুমন আলী একসময় দোভাষী ছিলেন। এখন দোকান দিয়েছেন। তার দোকানে ক্রেতা বেলারুশের নাগরিক ডেনিস। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রোসেমে কাজ করেন ডেনিস।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ইংরেজি অপ্রচলিত থাকায় ওই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ইংরেজিতে কথাবার্তা প্রায় দুরূহ বলেই মনে হলো। সম্ভবত ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে বিশ্বাস শপিং কমপ্লেক্সে আসা বেশিরভাগ বিদেশি-ই স্মিত হেসে কথোপকথন এড়িয়ে চললেন। 

মার্কেটের দোতলায় একটি গিফট আইটেম ও অ্যানটিক শপের দিকে নজর গেল। বিক্রেতা জানালেন, কিছুদিন আগেই পিতলের একটি দাবার সেট বিক্রি করেছেন, যার দাম ১৫ হাজার টাকা। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ও রাশিয়ার রাজনৈতিক যোগযোগ কমে আসার পাশাপাশি যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও কমে এসেছিল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে সেটিই যেন ভিন্নরূপে হাজির হয়েছে।

তবে দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখানকার বেশিরভাগ পণ্যই চীন থেকে আমদানি করা।

মার্কেট ছাড়ার সময় মনে হল, সম্পূর্ণ নতুন মেলবন্ধন হচ্ছে রুশ-বাংলাদেশের মধ্যে। আর বাংলাদেশে এসে রুশরা তাদের এক সময়ের বৈরী রাষ্ট্র চীনাদের পণ্যও কিনছে দেদারসে!