প্রতিবছরই কোভিডের টিকা নিতে হবে, এমন দিন আসছে: ফাইজার প্রধান

ছবি রয়টার্স থেকে
টিকানির্মাতা কোম্পানি ফাইজারের প্রধান ড. আলবার্ট বোর্লা বলেছেন, করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে সামনে হয়তো সবারই বছর বছর টিকা নেওয়া লাগতে পারে।

‘উচ্চ মাত্রার সুরক্ষা’ বজায় রাখার জন্যই প্রতিবছর এই টিকা লাগবে, আর এমনটা চলতে পারে বহু বছর, বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন তিনি।

ফাইজারের এই প্রধান নির্বাহী বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাবের আগে।

যুক্তরাজ্য সম্প্রতি ফাইজার-বায়োএনটেকের কাছ থেকে আরও ৫ কোটি ৪০ লাখ ডোজ এবং মডার্নার কাছ থেকে ৬ কোটি ডোজ কেনার চুক্তি করেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এসব অতিরিক্ত ডোজ সরবরাহ করা হবে।

যুক্তরাজ্যই প্রথম দেশ হিসেবে এক বছর আগে ফাইজার-বায়োএনটেকের কোভিড টিকা জরুরি ব্যবহারে অনুমোদন দিয়েছিল।

বোর্লার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ফাইজার ও মডার্নার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নতুন চুক্তির ঘোষণা আসেনি।

এসব চুক্তিতে ওমিক্রন এবং এরপরও যদি কোনো ‘উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্টের’ আবির্ভাব ঘটে সেগুলো মোকাবেলায় উপযোগী ভ্যাকসিন সরবরাহের কথাও বলা আছে, জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বোর্লা তার সাক্ষাৎকারে জানান, ফাইজার এরই মধ্যে ভারতে প্রথম শনাক্ত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ও দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত বেটা ভ্যারিয়েন্টের উপযোগী ভ্যাকসিন বানিয়েছে।

কোম্পানিটি এখন ওমিক্রন মোকাবেলায় তাদের টিকায় কোনো পরিবর্তন আনতে হবে কিনা তা নিয়ে কাজ করছে এবং ১০০ দিনের মধ্যে নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট উপযোগী টিকা বানানোর চেষ্টা করছে।

মহামারীর মধ্যে টিকা লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেছে এবং টিকা ছাড়া ‘আমাদের সমাজের মূল কাঠামোই ঝুঁকির মুখে পড়তো’, বলেছেন বোর্লা।

এ বছরের শেষ নাগাদ ফাইজার বিশ্বজুড়ে তাদের এমআরএনএ টিকার ৩০০ কোটি ডোজ সরবরাহ করতে পারবে, আগামী বছর তাদের পরিকল্পনা হচ্ছে ৪০০ কোটি ডোজ সরবরাহের।

স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিশ্বের অনেক সংগঠনের অভিযোগ, ফাইজার, বায়োএনটেক, মডার্না মহামারীর মধ্যে টিকা বেচে লাভ করে অনৈতিক কাজ করছে।

ফাইজার কেবল চলতি বছরই তাদের কোভিড টিকা বেচে অন্তত ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার লাভ করতে যাচ্ছে, কোম্পানিটির শেয়ার মূল্যও তরতরিয়ে বাড়ছে।

টিকার এই উচ্চমূল্যের জন্য আফ্রিকার অনেক অংশে টিকা এখনও দুর্লভ; মহাদেশটির অনেক দেশে এখনও কোভিড টিকার এক ডোজ পাওয়া নাগরিকের সংখ্যা প্রতি ২০ জনে একজনেরও কম।

বোর্লা অবশ্য এমনটা মনে করছেন না।

“মোদ্দা কথা হচ্ছে, লাখ লাখ জীবন রক্ষা পেয়েছে। আমরা বিশ্ব অর্থনীতির হাজার হাজার কোটি ডলার বাঁচিয়েছি,” বলেছেন তিনি। 

টিকা থেকে বিপুল লাভ করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ধনী দেশগুলোতে টিকার খরচ পড়ছে তাদের এক বেলার খাওয়ার সমান; স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে টিকা বিক্রির ক্ষেত্রে লাভ রাখা হয়নি বলেও জানান বোর্লা।

তবে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, ধনী দেশগুলো আগেভাগে ক্রয়াদেশ দেওয়ায় শুরুর দিকে অন্যদের পাঠানোর মতো টিকা তাদের কাছে ছিল না।

বোর্লা জানান, তাদের টিকা যেন সাধারণ রেফ্রিজারেটরে ৩ মাস সংরক্ষিত রাখা যায় এমন ফর্মুলা নিয়ে কাজ করছেন তারা। আগামী এক মাস বা এর কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই ওই পদ্ধতি বের করা যাবে বলেও আশাবাদী তিনি।

ফাইজারের এখনকার টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করা লাগে; যে কারণে স্বাস্থ্যসেবা অনুন্নত এমন দেশগুলোতে টিকাটি পাঠানোও চ্যালেঞ্জের।

কোম্পানিটি কোভিড রোগীদের জন্য মুখে খাওয়ার বড়ি প্যাক্সলোভিডও বানাচ্ছে; ট্রায়ালে এই বডিটি হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম বলে প্রমাণ দিয়েছে।

শিগগিরই এই বডিটি যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। যুক্তরাজ্যও আড়াই লাখ রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্যাক্সলোভিড বডি কিনছে।

ফাইজার ৫ বছরের নিচের শিশুদের উপর কোভিড টিকার ট্রায়ালও চালাচ্ছে। চলতি বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ৫ থেকে ১১ বছর বয়সীদের দেহে ফাইজারের টিকা ব্যবহারে অনুমোদন দেয়।

যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের অন্য দেশেও একই বয়সীদের এ টিকা দেওয়া হলে ভালো হবে, বলছেন বোর্লা।

চাহিদার দিক থেকে ফাইজার ও মডার্নার এমআরএনএ টিকা ইতিমধ্যেই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড টিকাকে ছাপিয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকারে বোর্লা যারা টিকা নিতে চান না, তাদের উদ্দেশ্যে জোরাল এক বার্তা দিয়েছেন।

“যারা ভয় পান, তাদের বলতে চাই, মানুষের যে অনুভূতি ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী, তা হল ভালোবাসা।

“আমি সবসময়ই এই যুক্তি দিই যে আরেকটি টিকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল আপনার স্বাস্থ্যের জন্যই জরুরি নয়, এটি অন্যদের স্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি, বিশেষ করে তাদের স্বাস্থ্য যাদেরকে আপনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন; তারা সেই মানুষ, যাদের সঙ্গে আপনার বেশি মেলামেশা হয়।

“তাই ভয়কে জয় করার সাহস নিন, সঠিক কাজটি করুন,” বলেছেন তিনি।